সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে ধারাবাহিক হামলা, ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি এবং রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল সরবরাহের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন সামরিক শক্তির পাশাপাশি জ্বালানি, অর্থনীতি ও নির্বাচনী রাজনীতিরও পরীক্ষা। তবে কোন সিদ্ধান্তের পেছনে কোন উদ্দেশ্য কাজ করছে, তা বুঝতে নিশ্চিত ঘটনা ও রাজনৈতিক অনুমানকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে একটি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকছে না। বিমানবন্দর বন্ধ হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল বা অন্য পথে পাঠানো হচ্ছে, জ্বালানির বাজারে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আর ওয়াশিংটনের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহ এই সংকটের নতুন মাত্রা সামনে এনেছে। ইয়েমেনের হুতিদের হামলায় সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণহানি ঘটেছে; পরবর্তী হামলার পর আবারও বিমান চলাচল স্থগিত করতে হয়েছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন,নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে না। অথচ এর আগেই মার্কিন সামরিক বাহিনীকে ইরানে বড় ধরনের অভিযান পুনরায় শুরুর সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছিল বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
এই ঘটনাগুলোকে একসঙ্গে রাখলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। সৌদি আরবের মতো বিপুল সামরিক ব্যয়কারী দেশ কেন তার গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরকে ধারাবাহিক হামলা থেকে পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখতে পারছে না? ইরানে নতুন হামলার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ার পরও ট্রাম্প কেন নির্বাচনের আগে সামরিক অভিযান না করার ঘোষণা দিলেন? রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল আনার সিদ্ধান্ত কি জ্বালানির মূল্য কমানোর চেষ্টা, নাকি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়ার কৌশল? আর যুক্তরাষ্ট্র কি একই সময়ে ইরান ও হুতিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক ফ্রন্ট খুলতে চাইছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে শুধু ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক জোট বা নেতাদের বক্তব্য নয়—জ্বালানির বাজার, যুদ্ধের ব্যয়, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী হিসাবও বিবেচনায় নিতে হবে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে কী ঘটেছে?
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ৮ অক্টোবরের হামলায় তিনজন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। সৌদি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে সৌদি আরবের জাতীয় বিমান সংস্থা সৌদিয়ার একজন পাইলটও ছিলেন। হাম লায় বিমানবন্দরের স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি বিমানেও ক্ষতির খবর আসে। হুতিরা আগের হামলাগুলোর দায় স্বীকার করে সৌদি আকাশ সীমায় বেসামরিক বিমান চলাচল বন্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছিল।
১০ অক্টোবর বিমানবন্দরে আবারও হামলার ঘটনা ঘটে। সৌদি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, এতে কয়েকজন আহত হন এবং বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। তবে এই হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গোষ্ঠী স্বীকার করেনি। ফলে আগের হামলার দায় হুতিরা নিলেও পরবর্তী হামলাটির দায় নিশ্চিতভাবে তাদের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।
ঘটনাগুলো অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে: সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক বিমান চলাচল অবকাঠামো এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা-ঝুঁকির মুখে। একাধিক হামলা, ফ্লাইট বাতিল এবং বিদেশি দূতাবাসগুলোর সতর্কবার্তা শুধু যাত্রীদের নিরাপত্তা নয়, দেশটির আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলছে।
হুতিদের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় বিমানবন্দরকে অন্তর্ভুক্ত করার কৌশলও তাৎপর্যপূর্ণ। বিমানবন্দর একটি দেশের সামরিক যোগাযোগ, অর্থনৈতিক কার্যক্রম, আন্তর্জাতিক যাতায়াত এবং পর্যটন-ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সেখানে হামলা চালিয়ে শুধু অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত করা নয়, যাত্রী ও বিমান সংস্থাগুলোর মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি করাও সম্ভব। ফলে প্রতিটি হামলার সামরিক ক্ষতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও তৈরি হয়।
মক্কা ও মদিনা ছাড়া অন্য বিমানবন্দর এড়িয়ে চলার হুঁশিয়ারি
হুতিদের পক্ষ থেকে সৌদি আকাশসীমা নিয়ে যে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে, তাতে মক্কা ও মদিনা ছাড়া অন্য অঞ্চলে বেসামরিক বিমান চলাচলের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারির কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে। এর উদ্দেশ্য সৌদি আরবের বিমান যোগাযোগের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং আকাশ পথকে সংঘাতের অংশে পরিণত করা বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
এখানে একটি ভৌগোলিক তথ্য পরিষ্কার করা প্রয়োজন। মক্কা শহরে কোনো বাণিজ্যিক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নেই। পবিত্র মক্কায় যাওয়া অধিকাংশ আন্তর্জাতিক যাত্রী জেদ্দার কিং আবদুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। অন্যদিকে, মদিনায় প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব দুলআজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর রয়েছে। তাই মক্কা ও মদিনাকে বিমানবন্দরের তালিকা হিসেবে উল্লেখ করা এবং ওই শহরগুলোর ওপরের আকাশসীমাকে আলাদা রাখা—দুটি এক বিষয় নয়। হুতিদের বক্তব্যের ভৌগোলিক অর্থ বুঝতে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ।
বেসামরিক বিমান চলাচলকে হুমকির মুখে ফেলা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও গুরুতর বিষয়। কোনো সংঘাতের পক্ষ যদি বিস্তৃত আকাশ সীমাকে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে, তবে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ, ক্রু এবং বিমানবন্দরকর্মীদের ঝুঁকি বাড়ে। বিমান সংস্থা গুলো তখন নিরাপত্তার হিসাব করে ফ্লাইট বাতিল, সময় পরিবর্তন কিংবা বিকল্প পথে চলাচলের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এর প্রভাব পড়ে যাত্রীদের পাশাপাশি বাণিজ্য, পর্যটন এবং জরুরি পরিবহনেও।
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা কি ব্যর্থ হচ্ছে?

সৌদি আরব বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ব্যয়বহুল প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কিনেছে। আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য রাডার, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান এবং নজরদারি প্রযুক্তিতে দেশটি বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। এত বিনিয়োগের পরও যদি গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরে বারবার হামলা হয়, তাহলে সেই প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কিন্তু কয়েকটি হামলা সফল হয়েছে বলেই পুরো প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে অকার্যকর বলা যাবে না। একইভাবে, সৌদি আরব মার্কিন সরঞ্জাম ব্যবহার করতে জানে না—এমন সিদ্ধান্তেও প্রমাণ ছাড়া পৌঁছানো যায় না। আধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষার কার্যকারিতা নির্ভর করে শুধু অস্ত্রের দামের ওপর নয়; রাডারের আওতা, গোয়েন্দা তথ্য, সতর্কবার্তা, ক্ষেপণাস্ত্রের গতি ও গতিপথ, আক্রমণের সংখ্যা, প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত এবং বিভিন্ন ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ওপরও।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার খবরও এসেছে। অন্যদিকে, রয়টার্স জানিয়েছে, ১০ অক্টোবরের হামলার আগে সৌদি আরবের আগাম সতর্কীকরণব্যবস্থা সতর্কবার্তা দেয়নি। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে: হামলাটি কেন আগেভাগে শনাক্ত করা যায়নি? সমস্যা কি রাডারের আওতায়, গোয়েন্দা তথ্যের ঘাটতিতে, শনাক্তকরণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে, নাকি হামলার ধরনে? এসব প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর দিতে বিস্তারিত সামরিক তথ্য প্রয়োজন, যা এখন পর্যন্ত জনসমক্ষে পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন ব্যবহার করে তাকে চাপে ফেলা সম্ভব হতে পারে। প্রতিটি হামলা ঠেকাতে একটি প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হলে প্রতিরক্ষার ব্যয়ও দ্রুত বাড়ে। আক্রমণকারী তুলনামূলক সস্তা অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ব্যয়বহুল অস্ত্র খরচ করতে বাধ্য করতে পারে। এ ধরনের অসম ব্যয়ের কৌশল আধুনিক যুদ্ধের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
সুতরাং রিয়াদের অভিজ্ঞতা সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষার দুর্বলতা ও প্রস্তুতি নিয়ে কঠিন প্রশ্ন তৈরি করছে। কিন্তু শুধু এই ঘটনা থেকে বলা যায় না যে যুক্তরাষ্ট্র সৌদিকে সরঞ্জাম দিয়েছে, অথচ সেগুলো ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেয়নি। এমন অভিযোগ প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশিক্ষণ, পরিচালনাগত সক্ষমতা এবং নির্দিষ্ট হামলার প্রযুক্তিগত বিবরণ সম্পর্কে স্বাধীন তথ্য দরকার।
ট্রাম্প কেন বললেন, নির্বাচনের আগে ইরানে হামলা নয়?
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। অ্যাক্সিওস ৭ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, ইরানে বড় ধর নের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু করার সম্ভাবনার জন্য মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে বলা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তখনও নেওয়া হয়নি। ৮ অক্টোবর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা করবে না।
এই দুই অবস্থানের মধ্যে আপাত বিরোধ থাকলেও সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করা এবং হামলার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া এক বিষয় নয়। একটি সরকার সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য সামরিক বিকল্প তৈরি রাখতে পারে, আবার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব বিবেচনায় সেগুলো ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত ও নিতে পারে।
ট্রাম্পের ঘোষণার একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো জ্বালানির দাম। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় জ্বালানি ও জীবনযাত্রার ব্যয় ভোটারদের মনোভাবকে প্রভাবিত করতে পারে। ইরানে নতুন হামলা হলে তেহরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়া, উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোর ঝুঁকি এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের অনিশ্চয়তা আরও বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়তে পারে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি, পরিবহন ও পণ্যের দামে।
তবে তেলের দামই ট্রাম্পের ঘোষণার একমাত্র কারণ—এমন দাবি নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। সামরিক ঝুঁকি, ইরানের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা, মিত্রদের নিরাপত্তা, যুদ্ধের আর্থিক ব্যয় এবং নির্বাচনী হিসাব একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ট্রাম্পের প্রকাশ্য বক্তব্য এবং প্রশাসনের পরিকল্পনারমধ্যে পার্থক্য থাকলেও সেটিকে সরাসরি প্রতারণার প্রমাণ বলা যায় না। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, যুক্তরাষ্ট্র কী কী পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযান পুনঃ রায় শুরু করতে পারে এবং সেই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক মূল্য কত।
রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার সিদ্ধান্তের তাৎপর্য-

ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ফোনালাপের পর রাশিয়া থেকে ডিজেল সরবরাহের সিদ্ধান্তের খবর এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে তাৎক্ষণিকভাবে তিন লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহের কথা ঘোষণা করা হয়েছে; পরবর্তী সময়ে আর ও সরবরাহের পরিকল্পনাও রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আগের বিধিনিষেধের প্রেক্ষাপটে এটি উল্লেখযোগ্য নীতিগত পরিবর্তন।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি স্পষ্ট। ডিজেলের দাম বাড়লে শুধু গাড়ির জ্বালানি খরচ বাড়ে না; পণ্য পরিবহন, কৃষিকাজ, সরব রাহব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দামেও প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি যখন রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে, তখন সরব রাহ বাড়ানোর ঘোষণা প্রশাসনের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তির বার্তা দিতে পারে।
কিন্তু ঘোষিত ডিজেলের পরিমাণ বিশ্ববাজারের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে কি না, তা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের সংশয় রয়েছে। এপি জানিয়েছে, বাজারে রাশিয়ার ডিজেল যোগ হলেও তা বড় পরিসরে মূল্য কমানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। কারণ বর্তমান সংকট শুধু ডিজেলের সরবরাহের নয়; মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা, পরিশোধন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং অন্যান্য বাজারে সরবরাহের ভারসাম্যও এতে ভূমিকা রাখছে।
অতএব, রাশিয়ার সঙ্গে এই সমঝোতাকে ট্রাম্পের ‘ভিক্ষা’ হিসেবে বর্ণনা করা রাজনৈতিক ভাষ্য হতে পারে, কিন্তু অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের জন্য তা যথেষ্ট নয়। বরং এর মধ্যে একটি বাস্তব বিরোধ রয়েছে: একদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাশিয়ার সরবরাহের ওপর নির্ভর করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, অর্থনৈতিক স্বার্থের মুখে ওয়াশিংটন তার অন্য বৈদেশিক নীতিগত অবস্থান কতটা নমনীয় করতে প্রস্তুত।
জ্বালানির দাম আর যুদ্ধের সিদ্ধান্ত-যোগসূত্র কতটা শক্ত?
তেলের বাজারের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক উত্তেজনার সম্পর্ক প্রত্যক্ষ। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃ তিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। এই জলপথে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে কিংবা হামলার আশঙ্কা বাড়লে বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ব্যবসায়ীরা সম্ভাব্য সংকটের ঝুঁকি দাম নির্ধারণের সময়ই বিবেচনায় নেন। বাস্তবে সরবরাহ কমে যাওয়ার আগেও তাই তেলের দাম বাড়তে পারে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে, অথবা হরমুজ প্রণালিতে চলাচল আরও অনিরাপদ হয়ে পড়লে, জ্বালানির বাজারে নতুন চাপ তৈরি হতে পারে। আবার রাশিয়ার কাছ থেকে অতিরিক্ত ডিজেল আনার মতো পদক্ষেপ কিছু বাজারে সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু এই ধরনের সরব রাহ ব্যবস্থা হরমুজের নিরাপত্তা, আঞ্চলিক অবকাঠামোর ক্ষতি বা বৈশ্বিক পরিশোধন-সংকটের বিকল্প নয়।
জ্বালানিবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাশিয়ার সরবরাহ যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে সীমিত স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু বৈশ্বিক দাম বড় পরিসরে কমানোর নিশ্চয়তা নেই। এ কারণে ট্রাম্পের ডিজেল-সংক্রান্ত ঘোষণাকে নির্বাচনের আগে বাজারকে শান্ত করার একটি চেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে; তবে তাঁর ইরান-নীতির সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা হিসেবে একে গ্রহণ করা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরান ও হুতিদের বিরুদ্ধে একসঙ্গে যুদ্ধ করবে?
রিয়াদ বিমানবন্দরে সর্বশেষ হামলার পর ট্রাম্পকে সাংবাদিকেরা জিজ্ঞাসা করেন,যুক্তরাষ্ট্র সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভি যানে যোগ দেবে কি না। তিনি বলেন, বিষয়টি বিবেচনা করা হবে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এই বক্তব্য সরাসরি সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়ার ঘোষণা নয়; এটি একটি সম্ভাবনার ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্র যদি একই সময়ে ইরান ও হুতিদের বিরুদ্ধে বড় পরিসরে অভিযান চালায়, তাহলে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়বে। ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি রাষ্ট্রীয় সংঘাতের বিষয়টি জড়িত; অন্যদিকে হুতিদের বিরুদ্ধে অভিযান ইয়েমেনের সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করতে পারে এবং সৌদি আরবের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হবে। দুই ক্ষেত্রেই ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, নৌপথ, বিমানঘাঁটি ও জ্বালানি অবকাঠামো ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
হুতিদের সামরিক সক্ষমতা নিয়ে অতিরঞ্জিত দাবি না করেও বলা যায়, তারা দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্য দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তাদের ভূগোল, বিচ্ছিন্ন লঞ্চ-ব্যবস্থা এবং অসম সামরিক কৌশল প্রতিপক্ষের জন্য সমস্যা তৈরি করে।অতীতে যুক্তরাষ্ট্রও তার মিত্র দের হামলা সত্ত্বেও হুতিদের সামরিক সক্ষমতা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়নি। ফলে নতুন অভিযান শুরু করা আর দ্রুত রাজনৈতিক বা সামরিক বিজয় অর্জন করা এক নয়।
তবে ‘ইরান ও হুতিদের কাছে এমন প্রযুক্তি আছে, যা পৃথিবীর আর কোথাও নেই’—এমন ধরনের দাবি যাচাইযোগ্য প্রযুক্তিগত প্রমাণ ছাড়া গ্রহণ করা উচিত নয়। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের কার্যকারিতা অস্ত্রের বৈশিষ্ট্য, ব্যবহারের কৌশল,গোয়েন্দা সহায়তা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে। নতুন প্রযুক্তির দাবি এবং কোনো নির্দিষ্ট হামলার সফলতা এক জিনিস নয়।
পাকিস্তান ও তুরস্ক কি সরাসরি যুদ্ধে নামবে?
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবে দেশটির উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সেনা ও সামরিক সম্পদ আগে থেকেই রয়েছে। মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় সদস্যদেশগুলো সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জোটটি প্রতিরক্ষামূলক এবং তাদের বাহিনী ইয়েমেনে সীমান্ত পেরিয়ে হুতিদের ওপর হামলা চালানোর জন্য মোতায়েন করা হবে না। পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান হুতিদের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিচ্ছে—এমন দাবিকেও দেশটির কর্মকর্তারা অনুমাননির্ভর বলে উল্লেখ করেছেন। ফলে পাকিস্তানের সামরিক উপস্থিতিকে সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে প্রবেশের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
তুরস্কের ভূমিকা সম্পর্কেও একই সতর্কতা প্রয়োজন। সামরিক সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় কিংবা সৌদি ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা—এস বের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ পরিচালনায় অংশগ্রহণের পার্থক্য রয়েছে। কোনো দেশ প্রতিরক্ষা চুক্তির সদস্য হলেই তার সেনারা অন্য দেশের ভূখণ্ডে সক্রিয় যুদ্ধে অংশ নেবে, এমন সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না।
সৌদি আরবে পাকিস্তানি সেনাদের প্রধান দায়িত্ব মোহাম্মদ বিন সালমানকে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাত থেকে রক্ষা করা—এমন দাবি কিছু বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় উঠে এলেও এর পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, সম্ভাব্য প্রাসাদ-ষড়যন্ত্র কিংবা ভবিষ্যতে মোহাম্মদ বিন সালমানের যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেওয়ার মতো পূর্বাভাসকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করারও ভিত্তি নেই। এগুলোকে রাজনৈতিক অনুমান হিসেবেই দেখা উচিত।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দেবে কারা?
এই সংঘাতের আলোচনা যখন ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান প্রতিরক্ষা, জোট ও রাষ্ট্রনেতাদের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে, তখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—এর মূল্য দেবে কারা? বিমানবন্দরে হামলা হলে বেসামরিক মানুষ আহত হন, ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাত্রী আটকে পড়েন, প্রবাসী শ্রমিক ও তাঁদের পরিবার অনিশ্চয়তায় পড়েন। জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পরিবহন, খাদ্য, কৃষি এবং শিল্প উৎপাদনে ছড়িয়ে পড়ে।
সৌদি আরবের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্যও এ পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, পর্যটন, বাণিজ্য এবং জ্বালানি খাতের বাইরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু রাজধানীর বিমানবন্দরে বারবার হামলা এবং বিদেশি বিমান সংস্থার ফ্লাইট বাতিলের ঘটনা আন্ত র্জাতিক ব্যবসায়িক আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে। বড় সম্মেলন ও বিনিয়োগ আয়োজন চালু রাখা সম্ভব হলেও নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় তৈরি হলে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াতে পারে, যা নির্বাচনী রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক কমান্ডের হিসাব নয়; অর্থনীতি ও ভোটারদের উদ্বেগও রাজনৈতিক নেতাদের সামনে বড় বিবেচনা হয়ে ওঠে।
সামনে কী হতে পারে?
পরবর্তী কয়েক দিন এবং সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ, হুতিদের পরবর্তী হামলা এবং ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ট্রাম্প এখনো হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন অভিযানে যোগ দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেননি। একইভাবে, ইরানে নির্বাচনের আগে সামরিক অভিযান না করার ঘোষণার পরও সামরিক বিকল্পগুলো পুরোপুরি বাতিল হয়েছে—এমন প্রমাণ নেই। তবে প্রস্তুতি থাকা মানেই অভিযান নিশ্চিত নয়।
যদি হামলা ও পাল্টা হামলা চলতে থাকে,তবে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে এবং সৌদি আরবের বিমান চলাচল ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠা মোর ওপর চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। অন্যদিকে, কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উত্তেজনা কমানো গেলে সামরিক সংঘাতের বিস্তার সীমিত করার সুযোগ তৈরি হবে। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক দেশগুলোর প্রতিরক্ষা-সহযোগিতার পাশাপাশি রাজনৈতিক যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, আধুনিক সামরিক শক্তি শুধু অস্ত্রের সংখ্যা বা প্রতিরক্ষা বাজেট দিয়ে মাপা যায় না। গোয়েন্দা তথ্য, প্রযুক্তির সমন্বয়, প্রতিরোধের সক্ষমতা, সরবরাহব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য—সবকিছু একসঙ্গে কাজ করতে হয়। একইভাবে বড় শক্তির সিদ্ধান্ত শুধু কৌশলগত প্রভাব বিস্তারের বিষয় নয়; তেলের দাম, বাণিজ্য, জনমত এবং নির্বাচনী চাপও সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা সৌদি আরবের নিরাপত্তা-ব্যবস্থার সামনে কঠিন পরীক্ষা তৈরি করেছে। আর ট্রাম্পের ইরান-নীতি ও রাশি য়ার ডিজেল সরবরাহের সিদ্ধান্ত দেখাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এখন সামরিক ময়দানের বাইরেও জ্বালানি ও রাজনীতির হিসাব বদলে দিচ্ছে। কিন্তু সামনে যুক্তরাষ্ট্র নতুন যুদ্ধে নামবে কি না, সৌদি আরব কতটা কার্যকরভাবে তার আকাশসীমা রক্ষা করতে পারবে কিংবা জ্বালানির দাম কতটা বাড়বে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই সংঘাতের পরিণতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার অভিঘাত পড়বে বিশ্ব অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, আল জাজিরা, অ্যাক্সিওস, ফিন্যানশিয়াল টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
ইকবাল মুন্না
সাংবাদিক ও নির্মাতা

মন্তব্য করুন