চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ১৫বছরের জন্য পেল দুবাইভিত্তিক বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। চুক্তিতে প্রায় ৬০০ কোটি টাকাএককালীন অর্থপ্রদান, প্রথম ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি আধুনিকায়ন বিনিয়োগ, বার্ষিক ফি এবং রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থা রয়েছে বলে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সরকারের প্রত্যাশা, এতে বন্দরের দক্ষতা বাড়বে, পণ্য খালাসে বিলম্ব কমবে এবং আমদানি-রপ্তানির ব্যয় হ্রাস পাবে। কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশিত না হওয়ায় রাজস্ব ভাগাভাগির প্রকৃত সূত্র, বিনিয়োগের বাধ্যবাধ কতা, শ্রমিকদের সুরক্ষা, ক্ষতিপূরণ এবং চুক্তি বাতিলের শর্ত নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। অনুসন্ধানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই চুক্তি বাংলাদে শের জন্য লাভজনক না ক্ষতিকর, তা শুধু ঘোষিত বিনিয়োগের অঙ্ক দিয়ে বোঝা যাবে না। জানতে হবে, বাংলাদেশ কী দিচ্ছে, বিনিময়ে কী পাচ্ছে এবং ১৫ বছর পর দেশের হাতে কী থাকবে।
চুক্তি স্বাক্ষর:আলোচনা পেরিয়ে এখন বাস্তব সিদ্ধান্ত-

২০২৬ সালের ৮ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে নিউমুরিং কনটেই নার টার্মিনাল (এনসিটি) ও সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এটি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব বা পিপিপি কাঠামোর অধীনে করা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী,ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালের দৈনন্দিন পরিচালনা,রক্ষণা বেক্ষণ ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব নেবে। অন্যদিকে, টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো ও মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে বলে সরকার জানিয়েছে। চুক্তিতে পারস্পরিক সম্মতি ও নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে মেয়াদ আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগও রয়েছে। অর্থাৎ মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হলে মোট সময় ৩০ বছর পর্যন্ত হতে পারে; তবে এটি স্বয়ংক্রিয় নবায়ন নয়।
চুক্তি স্বাক্ষরের দিনই ঢাকার আগারগাঁওয়ে অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে। চট্টগ্রাম বন্দরে ও শ্রমিক সংগঠন ও বন্দর রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পক্ষ চুক্তি বাতিলের দাবি জানিয়েছে। তাদের আপত্তির মূল বিষয় হলো, বাংলাদেশের অর্থে গড়ে ওঠা এবং ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য আয় ও কনটেইনার পরিচালনাকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দীর্ঘ সময়ের জন্য দেওয়ার আগে চুক্তির শর্ত, আর্থিক হিসাব ও শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গ তথ্য থাকা উচিত ছিল। শ্রমিক সংগঠন গুলো ১২ অক্টোবর এক দিনের অনশন কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে।
এখানে দুটি প্রশ্ন আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হতে পারে কি না। দ্বিতীয়ত, সে দক্ষতা অর্জনের বিনিময়ে যে আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্তে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা বাংলাদেশের আয়, শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ যথেষ্টভাবে রক্ষা করছে কি না। প্রথম প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর পাওয়া গেলেও দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
এনসিটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার। তৈরি পোশাকশিল্পের কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি, জ্বালানি, খাদ্যপণ্য ও অন্যান্য আমদানি পণ্য যেমন এই বন্দরের মাধ্যমে দেশে আসে, তেমনি রপ্তানিমুখী শিল্পের বিপুল পণ্যও এখান দিয়ে বিদেশে যায়। বন্দরে পণ্য আটকে থাকলে আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকের খরচ বাড়ে, সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হয় এবং সেই ব্যয়ের প্রভাব শেষ পর্যন্ত শিল্প উৎপাদন ও ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে।
এনসিটি চালু হয় ২০০৭ সালে। প্রথম আলোয় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, টার্মিনালটির নির্মাণকাজে প্রায় ৫৬৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছিল;যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ মোট বিনিয়োগের পরিমাণ পরে প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। টার্মিনালটিতে পাঁচটি জেটি এবং কনটেইনার ওঠানামার জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গ্যান্ট্রি ক্রেন রয়েছে। অর্থাৎ এটি নতুন কোনো প্রকল্প নয়; বাংলাদেশের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা, দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠিত অবকাঠামো।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের ৮ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটিতে প্রায় ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরি চালিত হয়েছে। টিইইউ বা ‘টোয়েন্টি-ফুট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট’ হলো ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের কনটেইনারের সমতুল্য আন্তর্জাতিক পরিমাপের একক। ওই পরিমাণ কনটেইনার চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিচালনার প্রায় ৪৪ শতাংশ। সহজভাবে বললে, বন্দরে যে পরিমাণ কনটেইনার ওঠানামা করে, তার প্রায় অর্ধেকই এই একটি টার্মিনাল সামলায়।
এই পরিসংখ্যান এনসিটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝায়।একই সঙ্গে প্রশ্ন তোলে,বিদ্যমান সরকারি স্থাপনাটি আরও দক্ষভাবে পরিচালনার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ কতটা প্রয়োজনীয় এবং সেই দক্ষতার বিনিময়ে বাংলাদেশকে কী পরিমাণ অর্থ, পরিচালন-অধিকার ও দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ ছেড়ে দিতে হচ্ছে।
শুরু থেকে চুক্তি পর্যন্ত: কীভাবে এগোল প্রক্রিয়া?

এনসিটিতে আন্তর্জাতিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিয়োগের পরিকল্পনা নতুন নয়। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষের প্রকল্প-তথ্য এবং আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ প্রকল্পটি নীতিগত অনুমোদন পায়। দুবাই সরকারের সঙ্গে সরকার-টু-সরকার বা জিটুজি কাঠা মোর আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে নিয়ে আলোচনা এগোয়। বিশ্বব্যাংক গোষ্ঠীর সদস্য আন্তর্জাতিক অর্থায়ন করপোরেশন বা আইএফসিকে লেনদেন-সংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে যুক্ত করা হয়। এ ধরনের পরামর্শকের কাজ সাধারণত প্রকল্পের কাঠামো, আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্ত, দর-কষাকষি এবং চুক্তির প্রস্তুতিতে সহায়তা করা। তবে পরামর্শক যুক্ত থাকার অর্থ এই নয় যে চুক্তির সব শর্ত বাংলাদেশের জন্য সর্বোত্তম—তা প্রমাণের জন্য আলাদা আর্থিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।
এনসিটি পরিচালনায় আগে দেশীয় প্রতিষ্ঠান সাইফ পাওয়ারটেক কাজ করত। ২০২৫ সালের ৬ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরদিন থেকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অধীন চিটাগং ড্রাই ডক লিমিটেড টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। নতুন চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ব্যবস্থায় এনসিটি পরিচালিত হচ্ছিল। ফলে ডিপি ওয়ার্ল্ড দায়িত্ব নেওয়ার আগেও টার্মিনালটি চালু ছিল এবং কনটেইনার পরিচালনা করছিল।
প্রক্রিয়াটি নিয়ে আইনি বিতর্কও হয়েছে। বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরাম বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া এবং উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র না হওয়ার প্রশ্ন তুলে উচ্চ আদালতে রিট করে।উচ্চ আদালতে বিভক্ত মতের পর তৃতীয় বেঞ্চ ২০২৬সালের ২৯ জানুয়ারি রিটের আবেদন খারিজ করে। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, জিটুজি নীতির আওতায় সরাসরি নির্বাচন করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল এবং সে প্রক্রিয়াকে বেআইনি প্রমাণের মতো যুক্তি আদালতের কাছে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে এই সিদ্ধান্তের অর্থ হলো না যে আদালত চুক্তির প্রতিটি আর্থিক শর্ত বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে লাভজনক বলে প্রত্যয়ন করেছে। আইনি বৈধতা আর অর্থনৈতিকভাবে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত—দুটি আলাদা বিষয়।
চুক্তির প্রক্রিয়া ২০২৬ সালের শুরুতে শ্রমিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে থমকে যায়। পরে নতুন সরকারের সময়ে আলোচনা আবার এগোয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬ আগস্ট পর্যন্ত দর-কষাকষি চলার পর ১৬ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বোর্ড এবং ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়া যায়। এরপর ৮ অক্টোবর চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এতে বোঝা যায়, সিদ্ধান্তটি এক দিনে নেওয়া হয়নি; কিন্তু দীর্ঘ প্রক্রিয়া চললেও তার চূড়ান্ত আর্থিক ও পরিচালনাগত শর্তগুলো সাধারণ মানুষের জন্য কতটা উন্মুক্ত রাখা হয়েছে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হয়েছিল কি?
এ প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাধারণভাবে বড় সরকারি প্রকল্পে একাধিক যোগ্য প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব তুলনা করা হলে সরকার মূল্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, পরিচালন দক্ষতা ও ঝুঁকি বণ্টনের ভিত্তিতে সেরা প্রস্তাব বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু এনসিটির ক্ষেত্রে আদালতের নথিতে জিটুজি নীতির অধীনে সরাসরি নির্বাচন প্রক্রিয়ার কথা রয়েছে। আদালত বলেছে, সংশ্লিষ্ট নীতিতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র সব ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নয় এবং কর্তৃপক্ষ সরাসরি নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে।
সরাসরি নির্বাচন মানেই যে সিদ্ধান্তটি খারাপ বা অনিয়মপূর্ণ, তা নয়। সরকার-টু-সরকার ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু উন্মুক্ত দরপত্র না হলে জনস্বার্থে আরও বেশি গুরুত্ব পায় নির্বাচিত প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবের আর্থিক মূল্যায়ন। অর্থাৎ অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান একই কাজ কম খরচে, বেশি রাজস্ব ভাগ দিয়ে কিংবা ভালো শ্রমিক সুরক্ষাসহ করতে পারত কি না, সেই তুলনামূলক বিশ্লেষণ প্রকাশ করা জরুরি। সরকার যদি মনে করে ডিপি ওয়ার্ল্ডই সবচেয়ে ভালো বিকল্প, তাহলে কেন এই প্রতিষ্ঠানকে বেছে নেওয়া হলো, এর প্রস্তাবে কী বিশেষ সুবিধা ছিল, অন্য সম্ভাব্য বিকল্পের তুলনায় কীভাবে লাভ বেশি হবে—এসব তথ্যের সারসংক্ষেপ প্রকাশ করলে বিতর্কের অনেকটাই তথ্যভিত্তিকভাবে নিষ্পত্তি করা সম্ভব।
চুক্তিতে কী আছে: সাধারণ ভাষায় মূল শর্ত
প্রকাশিত সরকারি বিবৃতি, ডিপি ওয়ার্ল্ডের ঘোষণা এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন মিলিয়ে চুক্তির মূল কাঠামো সম্পর্কে কয়েকটি বিষয় জানা যায়।
চুক্তির মেয়াদ: প্রাথমিক মেয়াদ ১৫ বছর। দুই পক্ষের সম্মতি ও নির্দিষ্ট শর্ত পূরণের ভিত্তিতে আরও ১৫ বছর বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। মেয়াদ বাড়ানোর শর্তগুলো পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে নবায়নের সিদ্ধান্ত কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে, তা জানতে চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারা প্রয়োজন।
পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ: ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনালের দৈনন্দিন পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, সরঞ্জাম উন্নয়ন এবং আধুনিকায়নের দায়িত্ব নেবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জমি, মূল অবকাঠামো ও মালিকানা বজায় রাখবে এবং তদারকি করবে বলে সরকার জানিয়েছে। তবে দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাওয়ায় বাস্তবে কে কোন সিদ্ধান্ত নেবে, কীভাবে সরকারি কর্তৃপক্ষ হস্তক্ষেপ করবে এবং নিয়মভঙ্গ হলে কোন প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেবে—এসবের বিস্তারিত ধারা গুরুত্বপূর্ণ।
এককালীন অর্থপ্রদান: ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৫ কোটি মার্কিন ডলার বা আনুমানিক ৬০০ কোটি টাকা দেবে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এর ২৫ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ পরিচালনার দায়িত্ব বুঝে নেওয়ার আগে পরিশোধ করার কথা।
আধুনিকায়ন বিনিয়োগ: প্রথম ১০ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এর মধ্যে সরঞ্জাম, প্রযুক্তি, পরিচালনব্যবস্থা ও আধুনিকায়নের জন্য প্রায় ৯ কোটি ডলারের ব্যয়ের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। বৃহত্তর প্যাকেজে ১৫ বছরে বিনিয়োগ ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে প্রায় ১৫ কোটি ডলারের কথা বলা হয়েছে। এসব অঙ্ক এক ধরনের অর্থ নয়: এককালীন অর্থপ্রদান সরাসরি বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে, আর আধুনিকায়ন ব্যয় হবে টার্মিনালে সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি স্থাপনে। তাই পুরো ১৫ কোটি ডলারকে নগদ অর্থে সরকারের হাতে আসবে, এমনভাবে ব্যাখ্যা করা সঠিক হবে না।
বার্ষিক ফি ও রাজস্ব ভাগাভাগি: বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকার নির্দিষ্ট ফি এবং টার্মিনাল থেকে আয়ের অংশ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এই রাজস্ব ভাগাভাগির প্রকৃত সূত্র নিয়ে সরকারি বক্তব্য ও প্রকাশিত সারসংক্ষেপে পার্থক্য রয়েছে। এ বিষয়টি চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিষ্পন্ন প্রশ্নগুলোর একটি।
কনটেইনার পরিচালনার ন্যূনতম নিশ্চয়তা: বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তার কথা জানানো হয়েছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে এই সীমা এক কোটি নয়, বরং ১০ লাখ টিইইউতে নামতে পারে। অর্থাৎ বছরে কত কনটেইনার পরিচালনার ন্যূনতম শর্ত থাকবে, তা ভবিষ্যতে বন্দরের নতুন সক্ষমতা যুক্ত হওয়ার সঙ্গে বদলাতে পারে। এই নিশ্চয়তা বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য আয় রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে শর্তের ব্যতিক্রম ও প্রয়োগের পূর্ণাঙ্গ ভাষা প্রকাশিত হয়নি।
কর্মসম্পাদন ও জরিমানা: নির্ধারিত কর্মসম্পাদনের লক্ষ্য পূরণ না হলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ওপর আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা রয়েছে বলে সরকারি সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, কিছু চুক্তিগত লক্ষ্য টানা তিন মাস পূরণ না হলে আর্থিক জরিমানা কার্যকর হতে পারে। কোন লক্ষ্য কীভাবে পরিমাপ করা হবে এবং জরিমানার সুনির্দিষ্ট হিসাব কী—তা পুরোপুরি যাচাই করতে চুক্তির সংশ্লিষ্ট ধারা প্রয়োজন।
রাজস্বের ৬৭ শতাংশ, নাকি ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ?
চুক্তি স্বাক্ষরের পর রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, প্রতি কনটেইনার থেকে পাওয়া রাজস্বের ৬৭ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষ পাবে। কিন্তু ইনভেস্ট বাংলাদেশ থেকে পাঠানো সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, টার্মিনালের গড় আয় অনুযায়ী বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। দুই বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে, এবং চুক্তির পূর্ণ পাঠ ছাড়া এই পার্থক্যের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়।
এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ, একটি সহজ উদাহরণে বোঝা যায়। ধরা যাক, একটি কনটেইনার পরিচালনা থেকে হিসাবযোগ্য আয় ১৫০ ডলার। আয় থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষের ভাগ ৬৭ শতাংশ হলে তার অংশ দাঁড়ায় ১০০ দশমিক ৫০ ডলার। কিন্তু প্রযোজ্য হার ৪০ শতাংশ হলে অংশ হবে ৬০ ডলার। বছরে লাখ লাখ কনটেইনার পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ব্যবধান বন্দর কর্তৃপক্ষের আয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এনসিটিতে প্রতি কনটেইনারে গড় আয় ছিল ১৬১ দশমিক ৮২ ডলার। সেই অঙ্কে ৬৭ শতাংশের হিসাব করলে বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ প্রায় ১০৮ ডলার ৪২ সেন্ট। আবার নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে কনটেইনারপ্রতি আয় ১৪০ থেকে ১৫০ ডলার; এই হিসাবে বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ প্রায় ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০০ ডলার ৫০ সেন্ট হতে পারে। কিন্তু এগুলো প্রকাশিত বর্তমান আয়ের ভিত্তিতে করা হিসাব—চুক্তির অধীনে নিশ্চিতপ্রাপ্তির অঙ্ক নয়।
প্রকৃত হিসাব জানতে হলে জানতে হবে, ‘রাজস্ব’ বলতে কোন কোন সেবা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, আয় থেকে কোনো ব্যয় বাদ দেওয়া যাবে কি না, গড় আয় নির্ধারণের সময়সীমা কী, কোন স্তরে কোন হার প্রযোজ্য এবং বেশি কনটেইনার পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজস্বের হার কীভাবে বাড়বে। এই তথ্য ছাড়া শুধু ৬৭ শতাংশের সংখ্যা শুনে চুক্তিকে লাভজনক ঘোষণা করা কিংবা ৪০ শতাংশের উল্লেখ দেখে ক্ষতিকর বলা—দুটিই অসম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত।
১৫ বছরে কত আয় হতে পারে? একটি সতর্ক হিসাব
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মোট আয় ছিল প্রায় ৬ হাজার ৬২৯ কোটি টাকা এবং মোট কনটেইনার পরিচালনা হয়েছিল প্রায় ৩৫ লাখ ২০ হাজার টিইইউ। এনসিটি মোট কনটেইনার পরিচালনার প্রায় ৪৪ শতাংশ সামলেছে। এই অনুপাত ধরে মোট বন্দরের আয়ের একটি আনুমানিক অংশ হিসাব করলে প্রায় ২ হাজার ৯১৭ কোটি টাকার অঙ্ক পাওয়া যায়। তবে এটি এনসিটির প্রকৃত আয় বা নিট মুনাফা নয়; এটি বন্দরের সামগ্রিক আয়ের ওপর কনটেইনার পরিচালনার অনুপাত প্রয়োগ করে পাওয়া একটি নির্দেশক হিসাব। বন্দরের মোট আয়ে অন্য সেবার আয়ও থাকতে পারে, আর টার্মিনালের পরিচালন ব্যয় আলাদাভাবে হিসাব করতে হবে। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি প্রতিষ্ঠান কত আয় করে এবং তার প্রকৃত মুনাফা কত—দুটি এক বিষয় নয়। কর্মীদের বেতন, বিদ্যুৎ, রক্ষণা বেক্ষণ, যন্ত্রপাতির প্রতিস্থাপন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয় বাদ দেওয়ার পরই নিট পরিচালন উদ্বৃত্তের চিত্র পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের প্রকৃত লাভ নির্ধারণে তাই তিনটি হিসাব তুলনা করা দরকার: প্রথমত, বর্তমানে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনসিটি পরিচালনা করতে বন্দর কর্তৃপক্ষের কত খরচ হয়; দ্বিতীয়ত, একই টার্মিনাল নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় আধুনিকায়ন করলে আগামী ১৫ বছরে আয় ও ব্যয়ের কী চিত্র দাঁড়াতে পারত; তৃতীয়ত, ডিপি ওয়ার্ল্ডের অধীনে রাজস্ব ভাগ, নির্দিষ্ট ফি, বিনিয়োগ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য আর্থিক শর্ত মিলিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকৃত প্রাপ্তি কত হবে। এই তুলনামূলক হিসাব ছাড়া চুক্তির আর্থিক মূল্য নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
কেন চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ্যে আসছে না?
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ না হওয়ার প্রশ্নে সরকারি বক্তব্য ও আইনি কাঠামো—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া বলেছেন, চুক্তির কিছু বিষয়ে গোপনীয়তার শর্ত রয়েছে, যার অধীনে উভয় পক্ষ কিছু তথ্য প্রকাশ করতে পারবে না। বিশেষ করে ন্যূনতম ট্যারিফ এবং ধাপে ধাপে রাজস্বের হার কত হবে, সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ওই শর্তের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বছরে একটি ন্যূনতম ট্যারিফ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নির্ধারিত ন্যূনতম কনটেইনারের পরিমাণের বেশি পরিচালনা হলে ধাপে ধাপে ট্যারিফের হার বাড়বে। কিন্তু ন্যূনতম ট্যারিফের অঙ্ক ও ধাপগুলোর বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
বাংলাদেশ সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আইন, ২০১৫-এর ৩৪ ধারায় প্রাক্যোগ্যতা, দরপত্র, দর-কষাকষি ও অনুমোদনসংক্রান্ত কিছু নথি গোপন রাখার বিধান রয়েছে। তবে ধারাটিতে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ বা সংশ্লিষ্ট আইনে ভিন্ন বিধান থাকলে তার কথাও বলা হয়েছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: দর-কষাকষির সময়কার সংবেদনশীল নথি গোপন রাখা এবং স্বাক্ষরিত চুক্তির সব শর্ত জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখা একই বিষয় নয়। শুধু আইনে গোপনীয়তার বিধান আছে বলেই পুরো চুক্তির প্রতিটি ধারা প্রকাশ করা যাবে না—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
সরকার অন্তত একটি জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য সংস্করণ প্রকাশ করতে পারে। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল কিছু অঙ্ক বা সূত্র বাদ রাখতে হলে সংশ্লিষ্ট ধারা, গোপন রাখার আইনগত ভিত্তি এবং গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির কাঠামো, বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা, কর্মসম্পাদনের লক্ষ্য, শ্রমিকদের সুরক্ষা, জরিমানা, নিরাপত্তা ও চুক্তি বাতিলের নিয়ম সম্পর্কে যথেষ্ট তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব।
প্রশ্নটি শুধু তথ্য পাওয়ার নয়; জনগণের সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সরকার কী শর্তে দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা জানার অধিকার ও জবাবদিহিরও প্রশ্ন। একটি চুক্তির গোপনীয়তা বিনিয়োগকারীর বৈধ বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা করতে পারে, কিন্তু তা যেন জনস্বার্থে প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
চুক্তির কোন গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলো এখনো পরিষ্কার নয়?
প্রকাশিত সারসংক্ষেপ থেকে চুক্তির মূল কাঠামো জানা গেলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
রাজস্বের সূত্র: বন্দর কর্তৃপক্ষের অংশ ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশের মধ্যে নির্ধারিত হলে তার ভিত্তি কী? কোন সেবা থেকে পাওয়া আয় ভাগাভাগির আওতায় পড়বে? কোন ব্যয় বাদ দেওয়া যাবে? আয় বাড়লে ভাগের হার কীভাবে পরিবর্তিত হবে? এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর জনসমক্ষে নেই।
বিনিয়োগের সময়সূচি: প্রায় ৯ কোটি ডলারের যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন কোন বছরে কত ব্যয়ে হবে, কোন যন্ত্রপাতি কেনা হবে, নির্ধারিত সময়ে বিনিয়োগ না করলে কী জরিমানা হবে এবং মেয়াদ শেষে সেই সম্পদের মালিকানা বা হস্তান্তরের নিয়ম কী—এসব জানতে চুক্তির বিনিয়োগসংক্রান্ত তফসিল প্রয়োজন।
কর্মসম্পাদনের সূচক: সরকার দ্রুত জাহাজ খালাস, কনটেইনার চলাচল, ক্রেনের উৎপাদনশীলতা ও ট্রাকের অবস্থানকাল কমানোর লক্ষ্য জানিয়েছে। কিন্তু প্রতিটি লক্ষ্য কখন পূরণ করতে হবে, কে তা পরিমাপ করবে এবং ব্যর্থতার জন্য কীভাবে জরিমানা নির্ধারিত হবে, তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশিত হয়নি।
শ্রমিকদের সুরক্ষা: বর্তমান শ্রমিকদের চাকরি, মজুরি ও সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে চাকরির ধারাবাহিকতা, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি, প্রযুক্তির কারণে কাজের ধরন বদলালে পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তির শর্তগুলো জনসমক্ষে পূর্ণাঙ্গভাবে নেই।
চুক্তি বাতিল ও ক্ষতিপূরণ: ডিপি ওয়ার্ল্ড বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করলে বাংলাদেশ কীভাবে চুক্তি বাতিল করতে পারবে, আগাম বাতিলে কত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বিরোধ কোন প্রক্রিয়ায় মীমাংসা হবে এবং ১৫ বছর শেষে যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো কী অবস্থায় ফেরত দিতে হবে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। এই তথ্যগুলো ছাড়া শুধু এককালীন অর্থপ্রদান বা রাজস্বের একটি শতাংশের ভিত্তিতে চুক্তির লাভ-ক্ষতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যাবে না।
সরকার কী সুবিধার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে?
চুক্তির পক্ষে সরকারের প্রধান যুক্তি হলো, ডিপি ওয়ার্ল্ডের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত পরিচালনব্যবস্থা এনসিটির কার্য কারিতা বাড়াতে পারে। নতুন স্ক্যানার, উন্নত বা প্রতিস্থাপিত ক্রেন, স্বয়ংক্রিয় প্রবেশপথ, ডিজিটাল প্রক্রিয়া ও কাগজবিহীন ব্যবস্থা চালু হলে কনটেই নার ওঠানামায় বিলম্ব কমতে পারে। সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রাকের অবস্থানকাল প্রায় ৯০ মিনিটে নামিয়ে আনা, দ্বিতীয় বছর থেকে ক্রেনের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবংটার্মিনালে জাহাজের অপেক্ষার সময় কমিয়ে আনা।নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিবের বক্তব্য অনুযায়ী,আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে জাহাজ ও কনটেইনার পরিচালনার সময় বর্তমানের তুলনায় অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে।
বন্দরে পণ্য আটকে থাকার সময় কমলে আমদানিকারকের জাহাজওপরিবহনসংক্রান্ত ব্যয় কমতে পারে। রপ্তানিকারকের পণ্য সময়মতো পাঠা নোর সুযোগ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের সরবরাহব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা উন্নত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের একটি মডেল ভিত্তিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের অবস্থানকাল এক দিন কমলে বাংলাদেশের রপ্তানি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ার সম্ভা বনা রয়েছে। এটি নির্দিষ্ট অনুমানের ভিত্তিতে করা মডেল, নিশ্চয়তাপ্রাপ্ত ফল নয়। তবু এটি বন্দরের দক্ষতা বাড়ানোর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বোঝায়।
সরকারি বিনিয়োগ সংস্থা ইনভেস্ট বাংলাদেশ বন্দর-অদক্ষতার কারণে বছরে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি হিসাবও উল্লেখ করেছে। এটিকে স্বাধীনভাবে নিরীক্ষিত সরকারি ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে নয়, সংস্থাটির দেওয়া অনুমান হিসেবে দেখা প্রয়োজন। তবে বন্দরে অদক্ষতার কারণে যে অর্থনৈতিক ব্যয় তৈরি হয়, তা কমাতে পারলে দেশের বাণিজ্য ও শিল্প খাত উপকৃত হতে পারে।
এখানে একটি সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এনসিটির ভেতরে কনটেইনার পরিচালনা দ্রুত হলেই বন্দরের সামগ্রিক বিলম্ব দূর হবে না। কাস্টমস ছাড়পত্র, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, কনটেইনার ডিপো, আমদানিকারকের পণ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য সরকারি সংস্থার সমন্বয়ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই চুক্তির সফলতা বিচার করতে শুধু কনটেইনারের সংখ্যা নয়, জাহাজের অপেক্ষা, পণ্য খালাসের সময়, ট্রাকের অবস্থানকাল এবং প্রতি কনটেইনারে মোট ব্যয়ও পরিমাপ করতে হবে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ কোথায়?
প্রথম লাভ হলো তাৎক্ষণিক অর্থপ্রাপ্তি। প্রায় ৬০০ কোটি টাকার এককালীন অর্থ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে আসার কথা। এর সঙ্গে বছরে নির্দিষ্ট ফি ও রাজস্ব ভাগাভাগির মাধ্যমে আয় পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ন্যূনতম কনটেইনার পরিচালনার শর্তও বন্দর কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য আয় রক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
দ্বিতীয় লাভ হতে পারে দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি। একই অবকাঠামো দিয়ে বেশি কনটেইনার পরিচালনা করা গেলে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের চাপ কিছুটা কমতে পারে। বন্দর কর্তৃপক্ষকে প্রতিটি নতুন সরঞ্জাম ও প্রযুক্তিতে নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজনও কমতে পারে, যদি চুক্তি অনুযায়ী এসব ব্যয়ের দায় পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বহন করে।
তৃতীয় লাভ হতে পারে প্রযুক্তি ও দক্ষতা স্থানান্তর। স্থানীয় কর্মীরা আধুনিক সরঞ্জাম পরিচালনা, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানের কার্যপ্রণালি বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেলে বাংলাদেশের নিজস্ব জনবল দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হতে পারে।
চতুর্থ লাভ হতে পারে বাণিজ্য ব্যয় কমানো। বন্দরে জাহাজ বা কনটেইনারের অপেক্ষা কমলে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও পূর্বানুমানযোগ্য হতে পারে। এতে শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি পণ্যের সময়মতো সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সুবিধা তৈরি হতে পারে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য লাভ, নিশ্চিত ফল নয়। এসব অর্জন নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, কত বিনিয়োগ হচ্ছে, কর্মসম্পাদনের লক্ষ্য কতটা পূরণ হচ্ছে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ কতটা কঠোরভাবে তদারকি করতে পারছে তার ওপর।
সম্ভাব্য ক্ষতি ও ঝুঁকি কোথায়?
সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি হলো সুযোগব্যয়। এনসিটি আগে থেকেই চালু এবং উল্লেখযোগ্য কনটেইনার পরিচালনাকারী একটি টার্মিনাল। বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এটি আধুনিকায়ন করলে কত টাকা লাগত, কত আয় বাড়তে পারত এবং ১৫ বছরে কী পরিমাণ নিট উদ্বৃত্ত অর্জিত হতে পারত—তার সঙ্গে ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব তুলনা করা দরকার। যদি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কম খরচে সমপরিমাণ দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব হতো, তাহলে বিদেশি পরিচালনাকারী নিয়োগের আর্থিক সুবিধা কম হতে পারে। আবার প্রতিষ্ঠানটি যদি উল্লেখযোগ্যভাবে দক্ষতা বাড়ায়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লাভ বেশি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তুলনামূলক হিসাব ছাড়া কোনো একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না।
দ্বিতীয় ঝুঁকি হলো রাজস্বের ওপর প্রভাব। এনসিটি থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ কত আয় পেত এবং চুক্তির অধীনে কত পাবে—এ তুলনাটি স্পষ্ট হওয়া দরকার। আয় ভাগাভাগির সূত্র অস্পষ্ট থাকলে বা নির্ধারিত হারের বাস্তব প্রয়োগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা না গেলে সরকার তার প্রাপ্য অর্থ ঠিকমতো পাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
তৃতীয় ঝুঁকি হলো শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ। স্বয়ংক্রিয়তা কিছু প্রচলিত কাজের প্রয়োজন কমাতে পারে, যদিও নতুন প্রযুক্তি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন তৈরি হতে পারে। চাকরি, মজুরি ও সুবিধা অক্ষুণ্ন রাখার প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কার্যকর করতে হলে সেগুলো চুক্তিতে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে থাকতে হবে এবং লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
চতুর্থ ঝুঁকি হলো সরকারি তদারকির সক্ষমতা। মালিকানা বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতে থাকলেও দৈনন্দিন পরিচালনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকবে। ফলে আয়-ব্যয়ের হিসাব, যন্ত্রপাতির অবস্থা, বিনিয়োগের অগ্রগতি এবং কর্মসম্পাদনের সূচক স্বাধীনভাবে যাচাই করার সক্ষমতা বন্দর কর্তৃপক্ষের থাকতে হবে। কেবল মালিকানা বজায় থাকলেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত হয় না।
পঞ্চম ঝুঁকি হলো দীর্ঘমেয়াদি দায় ও চুক্তি বাতিলের শর্ত। ১৫ বছর অনেক দীর্ঘ সময়। এই সময়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি, পরিবহন ব্যয় ও বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান বদলে যেতে পারে। চুক্তির মেয়াদে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য পূরণ না করলে কী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে, আগাম চুক্তি বাতিলে কত ক্ষতিপূরণ প্রযোজ্য হবে এবং মেয়াদ শেষে যন্ত্রপাতি কী অবস্থায় ফেরত দিতে হবে—এসব শর্ত বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই ঝুঁকিগুলো ঘটবেই—এমন প্রমাণ নেই। বরং প্রশ্ন হলো, চুক্তির শর্তে সেগুলো প্রতিরোধ করার মতো যথেষ্ট সুরক্ষা আছে কি না। পূর্ণাঙ্গ চুক্তি প্রকাশ না হওয়ায় সেই মূল্যায়ন এখনও অসম্পূর্ণ।
জাতীয় নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ: মালিকানা থাকলেই কি যথেষ্ট?
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর-স্থাপনা পরিচালনার দায়িত্ব দিলে নিরাপত্তা ও তথ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। এনসিটি দিয়ে কোন পণ্য প্রবেশ করছে, কোন জাহাজ কখন আসছে, কনটেইনার কোথায় রয়েছে এবং বন্দর কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে—এসব তথ্য অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারের বক্তব্য, টার্মিনালের জমি,মূল অবকাঠামো,মালিকানা এবংসার্বিক নিয়ন্ত্রণ চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে।কাস্টমস, অভিবাসন, নিরাপত্তা ও অন্যান্য সার্বভৌম সরকারি দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে—এমন কোনো ঘোষণা নেই। তবে টার্মিনালের দৈনন্দিন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা ডিপি ওয়ার্ল্ড করবে।
এখানে মনে রাখতে হবে, মালিকানা এবং দৈনন্দিন পরিচালনার ক্ষমতা এক বিষয় নয়। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রয়ো জন হবে পরিচালন-তথ্যে প্রবেশাধিকার, আয় নিরীক্ষার ক্ষমতা, নিরাপত্তা পরিদর্শন, জরুরি অবস্থায় হস্তক্ষেপ এবং সাইবার নিরাপত্তার বিষয়ে স্পষ্ট অধিকার। প্রকাশিত সারসংক্ষেপে সিসিটিভি নজরদারি এবং নির্দিষ্ট সময় অন্তর পরিচালন ও রাজস্বের তথ্য জমা দেওয়ার ব্যবস্থার কথা রয়েছে। কিন্তু এসব ব্যবস্থার বিস্তারিত প্রয়োগ, তদারকির স্বাধীনতা এবং চুক্তি ভঙ্গের পরিণতি জানতে পূর্ণাঙ্গ শর্ত প্রয়োজন।
কোনো প্রমাণ ছাড়া বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার কারণে জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি শুধু সরকারি মালিকানা বজায় থাকলেই নিরাপত্তার সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে যায়—এমন ধারণাও যথেষ্ট নয়। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি প্রয়োজন।
নতুন টার্মিনাল চালু হলে কী বদলাবে?
চট্টগ্রাম বন্দরের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মধ্যে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালও রয়েছে। ইনভেস্ট বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে যুক্ত এই প্রকল্প ২০৩০ সালের দিকে চালুর লক্ষ্যে এগোচ্ছে। নতুন টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের মোট কনটেইনার পরিচালনার সক্ষমতা বাড়তে পারে এবং বিভিন্ন টার্মিনালের মধ্যে কাজ ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ কারণেই এনসিটি চুক্তিতে ন্যূনতম বার্ষিক কনটেইনার পরিচালনার শর্ত ভবিষ্যতে ১২ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১০ লাখ টিইইউতে নামানোর সম্ভাবনা রাখা হয়েছে বলে প্রকাশিত হয়েছে। তবে নতুন টার্মিনাল কখন চালু হবে, তার সক্ষমতা কত হবে এবং এনসিটির পরিচালনায় তার কী প্রভাব পড়বে—এসবের ওপরও ভবিষ্যৎ আয় নির্ভর করতে পারে। শুধু বর্তমান কনটেইনারের সংখ্যা ধরে ১৫ বছরের আর্থিক হিসাব করা তাই যথেষ্ট নয়।
ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের অন্য বন্দর, রেলভিত্তিক কনটেইনার ডিপো, লজিস্টিকস পার্ক ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল নিয়েও আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এগুলো এনসিটি চুক্তির বাইরে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রকল্প; এনসিটি চুক্তির নিশ্চিত আর্থিক সুবিধার সঙ্গে সেগুলো যোগ করে দেখা ঠিক হবে না।
এখন সরকারের কাছে কোন তথ্যগুলো প্রয়োজন?
চুক্তির প্রকৃত লাভ-ক্ষতি বোঝার জন্য সরকার ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে অন্তত ছয়টি বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা জরুরি।
প্রথমত: এনসিটির গত পাঁচ বছরের প্রকৃত আয়, পরিচালন ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং নিট পরিচালন উদ্বৃত্ত কত ছিল?
দ্বিতীয়ত: বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনসিটি আধুনিকায়ন ও পরিচালনা করলে আগামী ১৫ বছরে সম্ভাব্য ব্যয় ও আয় কত হতো? ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাবের সঙ্গে এ হিসাব তুলনা করে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?
তৃতীয়ত: রাজস্ব ভাগাভাগির প্রকৃত সূত্র কী? ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশের হার কীভাবে নির্ধারিত হবে, কোন আয় ভাগাভাগির আওতায় আসবে এবং বছরে নির্দিষ্ট ফি ছাড়াও সরকারের আর কী প্রাপ্তি থাকবে?
চতুর্থত: এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ কোন সময়ে, কোন কোন খাতে ও কীভাবে ব্যয় হবে? প্রতিশ্রুতি পূরণ না হলে কী জরিমানা হবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ কীভাবে বিনিয়োগ যাচাই করবে?
পঞ্চমত: শ্রমিকদের চাকরি, মজুরি, সুযোগ-সুবিধা, প্রশিক্ষণ ও পদোন্নতির অধিকার চুক্তিতে কীভাবে সুরক্ষিত হয়েছে? এসব অধিকার লঙ্ঘিত হলে শ্রমিকেরা কী প্রতিকার পাবেন?
ষষ্ঠত: চুক্তি বাতিল, ক্ষতিপূরণ, বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরাপত্তা তদারকি এবং ১৫ বছর শেষে যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো হস্তান্তরের সুনির্দিষ্ট শর্ত কী?
এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে সরকার চুক্তির সম্ভাব্য সুবিধার পক্ষে তথ্যভিত্তিক যুক্তি দিতে পারবে। একই সঙ্গে শ্রমিক সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নাগরিক সমাজও নির্দিষ্ট শর্তের ভিত্তিতে সমর্থন বা আপত্তি জানাতে পারবে। বিতর্ক তখন অনুমান বা রাজনৈতিক অবস্থানের বদলে যাচাইযোগ্য তথ্যের ওপর দাঁড়াবে।
উপসংহার: চুক্তির সাফল্য নির্ধারণ করবে বাস্তব ফল
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ১৫ বছরের দায়িত্ব দেওয়া বাংলাদেশের বন্দর ব্যবস্থাপনায় একটি বড় সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও দক্ষ পরিচালনব্যবস্থা কাজে লাগাতে পারলে দেশের বাণিজ্য ব্যয় কমানো, কনটেইনার পরিচালনার সময় হ্রাস এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এসব সুবিধা এখনো প্রত্যাশা; চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো অর্জিত হয়ে যায়নি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের বিনিয়োগে গড়ে ওঠা একটি প্রতিষ্ঠিত ও গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের পরিচালনার দায়িত্ব দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ায় সরকারি আয়, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ, তদারকির সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি দায় নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, সেগুলোরও তথ্যভিত্তিক উত্তর প্রয়োজন।
প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর, এককালীন অর্থপ্রদান প্রায় ৬০০ কোটি টাকা, প্রথম ১০ বছরে আধুনিকায়ন বিনিয়োগ এক হাজার কোটি টাকার বেশি এবং বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য রাজস্ব ভাগাভাগি ও বার্ষিক ফি রয়েছে। তবে রাজস্বের সুনির্দিষ্ট সূত্র, কর্মসম্পাদনের পূর্ণাঙ্গ মানদণ্ড, বিনিয়োগের খাতভিত্তিক সময়সূচি, শ্রমিক সুরক্ষার বাস্তব প্রয়োগ এবং চুক্তি বাতিলের আর্থিক পরিণতি প্রকাশিত না হওয়ায় লাভ-ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো করা যাচ্ছে না।
তাই চুক্তিটিকে নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক বা ক্ষতিকর—কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করে বিচার করা সমীচীন নয়। বরং দেখতে হবে, ১৫ বছর শেষে বাংলাদেশ কত আয় পেয়েছে, বন্দরের দক্ষতা কতটা বেড়েছে, আমদানি-রপ্তানির ব্যয় কতটা কমেছে, স্থানীয় শ্রমিকদের দক্ষতা কতটা উন্নত হয়েছে এবং রাষ্ট্র তার গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে পেরেছে কি না।
দেশের সম্পদের মালিকানা বাংলাদেশের হাতে থাকা গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সেই সম্পদ থেকে সর্বোচ্চ জনস্বার্থ নিশ্চিত করাই চূড়ান্ত পরীক্ষা। চুক্তির প্রকাশযোগ্য পূর্ণাঙ্গ সংস্করণ, স্বাধীন আর্থিক মূল্যায়ন এবং নিয়মিত কর্মসম্পাদন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে শুধু জনআস্থা বাড়বে না, ভবিষ্যতেও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ শক্তিশালী হবে।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, দ্য ডেইলি স্টার, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, ঢাকা ট্রিবিউন, ডিপি ওয়ার্ল্ড, ইনভেস্ট বাংলাদেশ, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, বাংলাদেশ আইনভান্ডার, বিশ্বব্যাংক।
ইকবাল মুন্না
সাংবাদিক ও নির্মাতা

মন্তব্য করুন