লঞ্চের ভাড়া বাড়ে, কিন্তু সেবার মান বাড়ে না—এ কেমন নিয়ম? আজকের এই কথাগুলো কোনো হঠাৎ তৈরি হওয়া অভিযোগ নয়। জন্মের পর থেকে আজ পর্যন্ত নদীপথে লঞ্চে যাতায়াত করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়ে আসছে, বছরের পর বছর ধরে সেই একই চিত্র দেখে আসছি। সময় বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, সবকিছুর দাম বেড়েছে—কিন্তু লঞ্চের যাত্রীসেবার ক্ষেত্রে যেন কোনো পরিবর্তনই নেই।
বরং দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রতি এক-দুই মাস পরপর কোনো না কোনো অজুহাতে লঞ্চের ভাড়া বাড়তে দেখা যায়। ভাড়া বাড়ানোর সময় যাত্রীদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়ার বিষয়টি খুব সহজেই বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ভাড়া বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীসেবার মান কোথায় বাড়ে?
এই গরমের সময় লঞ্চে উঠলে মনে হয়, যাত্রীরা যেন মানুষ নয়! নেই পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা, নেই পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, নেই যাত্রীদের স্বস্তিতে বসার পরিবেশ। প্রচণ্ড গরমে ছোট শিশু, বয়স্ক মানুষ, পুরুষ, নারী, অসুস্থ ব্যক্তি—সবারই চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
একদিকে বাইরে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে লঞ্চের ভেতরে গাদাগাদি করে যাত্রী। অনেক সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, স্বাভাবিকভাবে বসা বা দাঁড়ানোর জায়গাটুকুও পাওয়া যায় না। অথচ এই যাত্রার জন্যই যাত্রীদের কাছ থেকে দিনের পর দিন বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে।
লঞ্চের সিটগুলোর অবস্থাও বহু বছর ধরে প্রায় একই রকম। এক সীটে ৪-৫ জন, পুরোনো, অস্বস্তিকর—কিন্তু সেগুলোর উন্নয়ন বা পরিবর্তনের যেন কোনো প্রয়োজনই নেই। যাত্রীদের কাছ থেকে নিয়মিত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই অর্থের বিনিময়ে যাত্রীদের মৌলিক সুবিধাগুলো নিশ্চিত করার বিষয়টি যেন কারও দায়িত্ব নয়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো সময়ানুবর্তিতা।
লঞ্চ কখন গন্তব্যে পৌঁছাবে—তার যেন কোনো নিশ্চয়তা নেই। একজন যাত্রীকে হয়তো জরুরি কাজে যেতে হবে, কারও চাকরির সময় আছে, কারও পরীক্ষা, চিকিৎসা বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে। কিন্তু লঞ্চের সময়সূচির কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় যাত্রীদের প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। নির্দিষ্ট সময়ে লঞ্চ ছাড়বে এবং নির্দিষ্ট সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাবে—এটি কি খুব বেশি কিছু চাওয়া? যদি একটি পরিবহন ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নেয়, তাহলে সেই পরিবহন ব্যবস্থার কিছু মৌলিক দায়িত্বও থাকা উচিত।
যেমন—
✅ নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে লঞ্চ পরিচালনা করা।
✅ লঞ্চে পর্যাপ্ত ফ্যান ও আলো নিশ্চিত করা।
✅ পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা।
✅ পুরোনো ও নষ্ট সিট পরিবর্তন করা।
✅ লঞ্চের ভেতর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা।
✅ অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করা।
✅ যাত্রীদের সঙ্গে দায়িত্বশীল ও ভদ্র আচরণ করা।
✅ ভাড়ার বিষয়ে স্বচ্ছতা রাখা।
✅ নিয়মিত লঞ্চের রক্ষণাবেক্ষণ করা।
✅ যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
আমরা ভাড়া দিতে আপত্তি করছি না। একটি ভালো সেবা পেলে তার জন্য যথাযথ ভাড়া দেওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা হলো—ভাড়া বাড়ছে, অথচ সেবার মান সেই আগের জায়গাতেই পড়ে আছে।
আজকের সময়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে। এর মধ্যে বারবার যাতায়াতের ভাড়া বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। তাই ভাড়া বাড়ানোর আগে অন্তত প্রশ্ন করা উচিত—যাত্রীদের কী বাড়তি সুবিধা দেওয়া হচ্ছে? একজন যাত্রী শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য টাকা দেয় না; সে নিরাপদে, স্বস্তিতে এবং যুক্তিসঙ্গত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রত্যাশা করে। শুধু ভাড়া বাড়িয়ে একটি পরিবহন ব্যবস্থা আধুনিক হয় না। আধুনিকতা আসে সেবার মানোন্নয়ন থেকে, নিয়ম-শৃঙ্খলা থেকে, যাত্রীদের প্রতি দায়িত্বশীলতা থেকে।
দুঃখের বিষয়, আমরা বছরের পর বছর ধরে একই সমস্যার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করছি। ছোটবেলা থেকে যে লঞ্চের অবস্থা দেখে আসছি, আজও অনেক ক্ষেত্রে সেই একই অবস্থা। এত বছর পার হয়ে গেলেও যদি যাত্রীসেবায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আসে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এতদিনে উন্নয়নটা হলো কোথায়? আমরা কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করতে চাই না। আমরা চাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, লঞ্চ মালিক ও পরিচালনাকারীরা বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখুক। লঞ্চ চলবে, ভাড়া থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তার সঙ্গে মানসম্মত যাত্রীসেবাও নিশ্চিত করতে হবে।
কারণ—
যাত্রী কোনো বোঝা নয়।
যাত্রী কোনো দয়া নিতে আসে না।
যাত্রী তার নিজের টাকা দিয়ে সেবা গ্রহণ করে।
তাই একজন যাত্রী হিসেবে আমাদেরও প্রশ্ন করার অধিকার আছে—
ভাড়া যদি বাড়ে, তাহলে সেবার মান বাড়বে না কেন?
লঞ্চের সিট পরিবর্তন হবে না কেন?
এই প্রচণ্ড গরমে পর্যাপ্ত ফ্যান থাকবে না কেন?
লঞ্চ নির্দিষ্ট সময়ে চলবে না কেন?
যাত্রীদের জন্য ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে না কেন?
আমরা বিলাসবহুল কোনো সেবা দাবি করছি না। আমরা শুধু চাই ন্যায্য ভাড়ার বিনিময়ে ন্যায্য সেবা।
আজ যারা লঞ্চে নিয়মিত যাতায়াত করেন, তারা সবাই জানেন বাস্তব পরিস্থিতি কী। তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে শুধু যাত্রীদের অসন্তোষ প্রকাশ করলেই হবে না—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্বশীলভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
ভাড়া বাড়ানোর আগে সেবার মান বাড়ান।
লঞ্চ আধুনিক করুন।
সিট পরিবর্তন করুন।
পর্যাপ্ত ফ্যানের ব্যবস্থা করুন।
সময় মেনে লঞ্চ পরিচালনা করুন।
যাত্রীদের মানুষ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান ও সুবিধা নিশ্চিত করুন।
আমরা উন্নয়ন চাই, কিন্তু শুধু ভাড়ার উন্নয়ন নয়—সেবারও উন্নয়ন চাই।
একই লঞ্চ, একই দুর্ভোগ, একই অব্যবস্থাপনা—শুধু ভাড়াটাই বারবার বাড়বে, এটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য যাত্রীসেবা হতে পারে না।
সবাই শেয়ার করেন।
—–সংগ্রহে -মাসুম