বাংলাদেশের গ্যাসকূপ বন্ধ, ত্রিপুরায় উত্তোলন: সীমান্তের ভূগর্ভস্থ সম্পদের হিসাব দেবে কে?

 ইকবাল মুন্নার দৃষ্টিপাত

নিয়মিত কলাম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্তে গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার পরও বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। অন্যদিকে, ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে কয়েক দশক ধরেই চলছে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন। দুই দেশের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

কসবা-১ কূপ কেন বন্ধ রাখা হলো, ভারতের উৎপাদন বাংলাদেশের সম্ভাব্য গ্যাসভাণ্ডারকে প্রভাবিত করছে কি না, আর রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ে অনুসন্ধানের পরও দেশীয় সম্পদ কাজে লাগানো গেল না কেন—এসব প্রশ্নের জবাব এখন জরুরি। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা অব্যবহৃত পড়ে থাকবে, অথচ তার প্রকৃত অবস্থা জানার জন্য জনগণকে অপেক্ষা করতে হবে—এ পরিস্থিতি গ্রহণযোগ্য নয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার তারাপুর এলাকায় ২০১৮ সালে কসবা-১ অনুসন্ধানকূপ খনন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি—বাপেক্স। ওই বছরের ২৩ অক্টোবর প্রায় ২ হাজার ৯৭৫ মিটার গভীরতায় কূপটির খননকাজ শেষ হয়। কূপে প্রাকৃতিক গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও সেটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিবেচনা করা হয়নি। ফলে সেখান থেকে নিয়মিত গ্যাস উৎপাদন শুরু হয়নি। বাপেক্সের বার্ষিক প্রতিবেদন ও জ্বালানিবিষয়ক প্রকাশিত বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অন্যদিকে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে ১৯৮০-এর দশক থেকেই প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন (ওএনজিসি) সেখানে একাধিক গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে এবং বিভিন্ন কূপ থেকে গ্যাস উত্তোলন করে বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করছে। অর্থাৎ সীমান্তের দুই পাশেই গ্যাসসম্পদ রয়েছে; কিন্তু বাংলাদেশের কসবা-১ কূপের সম্ভাবনা এখনো উৎপাদনে রূপ নেয়নি।

এই বৈপরীত্য শুধু স্থানীয় মানুষের হতাশার বিষয় নয়। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের কার্যকারিতা এবং সীমান্তের কাছাকাছি ভূগর্ভস্থ সম্পদের ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর সঙ্গেই এটি সম্পর্কিত।

গ্যাস পাওয়া গেল, উৎপাদন শুরু হলো না কেন?

 

কসবা-১ কূপের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি হলো, গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পরও কেন তা বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা গেল না।

বাপেক্সের মূল্যায়নে কূপটি বাণিজ্যিক উৎপাদনের উপযোগী ছিল না। তবে এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি জ্বালানিবিষয়ক বিশ্লেষণে বলা হয়েছিল, কূপটির গ্যাসস্তরের শিলার গঠন এমন হতে পারে, যেখানে গ্যাস থাকলেও শিলার মধ্য দিয়ে কূপে পর্যাপ্ত পরিমাণে গ্যাস প্রবাহিত হয় না। এ ধরনের গ্যাসকে ‘টাইট গ্যাস’ বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ প্রযুক্তি প্রয়োগ করে এ ধরনের স্তর থেকে গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ থাকে। তবে কসবা-১-এ সেই পদ্ধতি প্রয়োগ করলে উৎপাদন লাভজনক হবে কি না, তা নির্ধারণ করতে বিস্তারিত পরীক্ষা ও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কূপটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে বিবেচিত হয়েছিল—এটি একটি কারিগরি মূল্যায়ন; কিন্তু সেই মূল্যায়ন চূড়ান্ত, নাকি পরবর্তী সময়ে নতুন প্রযুক্তি দিয়ে কূপটির সম্ভাবনা যাচাই করা দরকার, সেটিও আলাদা প্রশ্ন।

কূপটি খনন, পরীক্ষা ও বন্ধ করার পেছনে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও অন্যান্য প্রস্তুতিমূলক কাজও করা হয়েছে। সেই বিনিয়োগের ফল কী হলো, প্রকল্পটি বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে কত টাকা ব্যয় অনাদায়ী থেকে গেল এবং ভবিষ্যতে কূপটি থেকে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা আরেকবার পরীক্ষা করা হয়েছে কি না—এসব তথ্য জনসমক্ষে থাকা উচিত।

ভারতের ত্রিপুরায় গ্যাস উত্তোলন, বাংলাদেশের কূপ বন্ধ: ভূগর্ভে কী ঘটছে?

ভারতের ত্রিপুরায় একাধিক আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন হয়। কিন্তু ত্রিপুরায় গ্যাস উত্তোলন চলছে বলে বাংলাদেশের কসবা-১-এর গ্যাসও সেখানে চলে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত শুধু ভৌগোলিক নৈকট্যের ভিত্তিতে দেওয়া যায় না।

প্রাকৃতিক গ্যাস ভূগর্ভে সাধারণত ছিদ্রযুক্ত শিলাস্তরে জমা থাকে। কোনো গ্যাসাধার দুই দেশের সীমান্ত অতিক্রম করে বিস্তৃত হতে পারে। যদি সীমান্তের দুই পাশের কূপ একই সংযুক্ত গ্যাসাধারের অংশ হয়, তাহলে এক পাশে গ্যাস উত্তোলনের ফলে চাপের পরিবর্তন অন্য পাশের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু এ ধরনের সংযোগ নিশ্চিত করতে ভূতাত্ত্বিক জরিপ, শিলাস্তরের তথ্য, কূপভিত্তিক চাপের পরিমাপ এবং উৎপাদনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করতে হয়।

কসবা-১ কূপের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরার কোনো নির্দিষ্ট উৎপাদনকূপের একই গ্যাসাধারে সংযোগ রয়েছে—এমন প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করার মতো প্রকাশ্য, নির্ভরযোগ্য ভূতাত্ত্বিক তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে ভারতের উৎপাদনই বাংলাদেশের কূপ বন্ধ থাকার কারণ, কিংবা বাংলাদেশের গ্যাস ভারতের কূপে চলে যাচ্ছে—এমন দাবি প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।

তবে এর অর্থ এই নয় যে প্রশ্নটি গুরুত্বহীন। বরং সীমান্তের দুই পাশের গ্যাসক্ষেত্রের ভূতাত্ত্বিক সম্পর্ক নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভারতের কোন উৎপাদনকূপ বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে কত দূরে, কসবা-১-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিলাস্তরের মিল রয়েছে কি না এবং উৎপাদনের কারণে চাপের কোনো পরিবর্তন ঘটছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করা হলে বিতর্কের বাস্তব ভিত্তি স্পষ্ট হতে পারে।

বাংলাদেশের গ্যাস অন্য দেশে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তা পরীক্ষা করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। আর এমন আশঙ্কার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি না থাকলে সেটিও তথ্য দিয়ে পরিষ্কার করা জরুরি।

রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত, কিন্তু জনগণ জানবে না কেন?

কসবা-১ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, অনুসন্ধানে গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেলে কূপটি কেন বন্ধ থাকবে এবং জমি অধিগ্রহণের পর তাঁদের কী লাভ হলো? ২০২৪ সালের আগস্টে কসবার স্থানীয় মানুষের একাংশ ‘কসবার গ্যাস কসবায় চাই’ দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

এই দাবির পেছনে স্থানীয় কর্মসংস্থান, শিল্পায়ন ও এলাকার অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রত্যাশা রয়েছে। তবে কূপটি থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া গেলে কসবা অবশ্যই বড় শিল্পাঞ্চলে পরিণত হতো—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। শিল্প স্থাপনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের পাশাপাশি বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, পানি, জমি, বিনিয়োগ ও বাজারের ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

তবু সম্ভাবনাময় কোনো সম্পদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর তার ব্যাখ্যা না পাওয়া জনআস্থার সংকট তৈরি করে। কূপটি বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক না হলে কোন পরীক্ষায় সেই সিদ্ধান্ত এসেছে, কত অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং বিকল্প পদ্ধতিতে উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে কি না—এসব তথ্য প্রকাশ করা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।

এখানে প্রশ্ন শুধু গ্যাস উৎপাদন নিয়ে নয়; রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের ফলাফল, প্রকল্পের স্বচ্ছতা এবং জনসম্পদের ব্যবস্থাপনা নিয়েও।

অন্য কূপগুলো নিয়েও প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব

বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধানকূপ খনন, গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত, উৎপাদন শুরু কিংবা কোনো প্রকল্প বন্ধ রাখার ঘটনা রয়েছে। কিন্তু সব কূপের ভূতাত্ত্বিক অবস্থা এক নয়। কোথাও গ্যাস পাওয়া গেলেও বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব নাও হতে পারে; কোথাও উৎপাদন শুরু হওয়ার পর চাপ কমে যেতে পারে; আবার কোথাও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ থাকতে পারে।

তাই বিভিন্ন কূপের নাম একসঙ্গে উল্লেখ করে সেগুলো ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো দায়িত্বশীল হবে না। প্রতিটি কূপের ক্ষেত্রে খনন ও পরীক্ষার ফলাফল, উৎপাদনযোগ্য মজুত, বন্ধের কারণ, প্রকল্পে ব্যয়, পরবর্তী পরিকল্পনা এবং কোনো চুক্তি বা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।

সরকার চাইলে দেশের সব অনুসন্ধানকূপ নিয়ে একটি হালনাগাদ তালিকা প্রকাশ করতে পারে। কোন কূপে গ্যাস পাওয়া গেছে, কোনগুলো বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক বিবেচিত হয়নি, কোনগুলো বন্ধ রয়েছে এবং কোনগুলোর পুনর্মূল্যায়ন সম্ভব—এসব তথ্য এক জায়গায় থাকলে জাতীয় জ্বালানি পরিকল্পনা ও জনজবাবদিহি উভয়ই শক্তিশালী হবে।

শেখ হাসিনার বক্তব্যের সঙ্গে গ্যাসের অভিযোগের সম্পর্ক

২০১৮ সালের ৩০ মে ভারত সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, সেটি ভারত সারা জীবন মনে রাখবে।” ওই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট ছিল ভারতের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সহযোগিতা। তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতবিরোধী সশস্ত্র তৎপরতা চালানোর সুযোগ বন্ধ করার ফলে ভারত শান্তি পেয়েছে।

এই বক্তব্য পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কে বারবার আলোচিত হয়েছে। কেউ একে নিরাপত্তা সহযোগিতার বক্তব্য হিসেবে দেখেছেন, কেউ প্রশ্ন তুলেছেন—বাংলাদেশ ভারতের জন্য কী কী সুবিধা নিশ্চিত করেছে এবং তার বিনিময়ে বাংলাদেশের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত হয়েছে।

কিন্তু বক্তব্যটি কসবা-১ কূপ বন্ধ রাখা বা বাংলাদেশের গ্যাস ভারতের হাতে তুলে দেওয়ার প্রমাণ নয়। এ দুটি বিষয়কে সরাসরি যুক্ত করতে হলে সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, চুক্তি বা অন্য নির্ভরযোগ্য নথি প্রয়োজন।

তবে বক্তব্যটি যে বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্ন সামনে আনে, তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই: বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সহযোগিতার প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে? জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষেত্রে দুই দেশের চুক্তি, সিদ্ধান্ত এবং সম্ভাব্য প্রভাব কি পর্যাপ্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণকে জানানো হয়েছে?

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং নিজের সম্পদ রক্ষা করা—দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় নয়। সহযোগিতা হতে হবে স্বচ্ছ, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট এবং বাংলাদেশের আইন ও জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গ্যাসের প্রতিটি সম্ভাবনা কেন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

 

বাংলাদেশে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা ও বিভিন্ন শিল্পে গ্যাসের প্রয়োজন রয়েছে। দেশীয় উৎপাদন চাহিদা মেটাতে না পারলে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরতা বাড়তে পারে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার ঝুঁকি বাড়ে।

এ কারণে কসবা-১-এর মতো অনুসন্ধানকূপের সম্ভাবনা নতুন করে মূল্যায়ন করার অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। তবে কূপটি চালু হলে কত গ্যাস পাওয়া যাবে, কত বছর উৎপাদন চলবে কিংবা জাতীয় চাহিদার কতটা পূরণ হবে—এসব তথ্য ছাড়া সম্ভাব্য আয় বা সুফলের নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া সম্ভব নয়।

বাপেক্সের অনুসন্ধান ও উন্নয়ন সক্ষমতা বাড়ানো, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংগ্রহ, বিশেষায়িত সেবা নেওয়া এবং সম্ভাবনাময় কূপগুলোর পুনর্মূল্যায়ন—এসব বিষয়ে বাস্তব পরিকল্পনা দরকার। কসবা-১-এর ক্ষেত্রে কোন বিকল্প প্রযুক্তি কার্যকর হতে পারে, সেই প্রযুক্তির ব্যয় কত এবং সম্ভাব্য উৎপাদনের তুলনায় বিনিয়োগটি লাভজনক হবে কি না, তা প্রকাশ্য কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষায় পরিষ্কার করা উচিত।

এটি শুধু কসবাবাসীর দাবি নয়; দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় অর্থের কার্যকর ব্যবহারের প্রশ্ন।

এখন সরকারের কাছে যে জবাবগুলো প্রয়োজন

তারাপুরের কসবা-১ কূপ নিয়ে বিতর্কের নিষ্পত্তি করতে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ, পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের কাছে অন্তত ছয়টি বিষয়ে স্পষ্ট জবাব প্রয়োজন।

১. কসবা-১ খনন, পরীক্ষা ও বন্ধ করতে মোট কত টাকা ব্যয় হয়েছে? প্রকল্পের নিরীক্ষা ও চূড়ান্ত ব্যয়ের হিসাব কী?

২. গ্যাসের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর কোন পরীক্ষা এবং কোন অর্থনৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে কূপটিকে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক নয় বলে বিবেচনা করা হয়েছিল? পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে কি?

৩. কূপটি বন্ধ রাখার পর উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, অতিরিক্ত পরীক্ষা বা পুনঃখননের মাধ্যমে গ্যাস উত্তোলনের সম্ভাবনা যাচাই করা হয়েছে কি? না হয়ে থাকলে কেন?

৪. অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণ এবং প্রকল্প বন্ধ থাকার পর জমির ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে?

৫. ভারতের ত্রিপুরার সীমান্তসংলগ্ন উৎপাদনকূপের সঙ্গে কসবা-১-এর কোনো ভূতাত্ত্বিক সংযোগ রয়েছে কি না, তা নির্ণয়ে স্বাধীন সমীক্ষা করা হবে কি?

৬. কূপ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তে কোনো অনিয়ম, স্বার্থের সংঘাত বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ থাকলে তা তদন্তের জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর প্রকাশ করা হলে গ্যাসক্ষেত্রটি নিয়ে দীর্ঘদিনের সন্দেহ ও বিতর্কের বাস্তব ভিত্তি যাচাই করা সম্ভব হবে। কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে তার দায় নির্ধারণ করতে হবে; আর কূপটি বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের অনুপযোগী হলে তার বৈজ্ঞানিক ও অর্থনৈতিক ব্যাখ্যাও জনগণের সামনে দিতে হবে।

উপসংহার: বাংলাদেশের সম্পদ নিয়ে নীরবতা নয়, চাই জবাবদিহি

কসবা-১ কূপের ঘটনা বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জায়গা। গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, অনুসন্ধানে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হয়েছে, কিন্তু বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়নি। সীমান্তের ওপারে ভারতের ত্রিপুরায় গ্যাস উৎপাদনের বাস্তবতা এই বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।

প্রকাশ্য তথ্য থেকে এখনই বলা যায় না যে বাংলাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে গ্যাসকূপ বন্ধ করে ভারতের জন্য গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ করে দিয়েছে। একইভাবে, কোনো পুনর্মূল্যায়ন ছাড়াই কূপটির সম্ভাবনা চিরতরে শেষ বলে ধরে নেওয়াও যুক্তিসংগত নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, স্বচ্ছ নথি এবং স্বাধীন পর্যালোচনা।

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ দেশের অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। সেই সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা জনগণকে জানাতে হবে। কূপটি উৎপাদনের উপযোগী হলে উত্তোলনের পরিকল্পনা দিতে হবে; উপযোগী না হলে তার কারণ ও বিকল্প ব্যবস্থা প্রকাশ করতে হবে; আর সিদ্ধান্তে অনিয়ম হয়ে থাকলে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশের গ্যাস বাংলাদেশের মানুষের সম্পদ। সেই সম্পদ কোথায়, কতটা রয়েছে, কীভাবে কাজে লাগানো হবে এবং কেন কোনো কূপ বন্ধ রাখা হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। কসবার তারাপুরে আর অস্পষ্টতা নয়; প্রয়োজন নথি প্রকাশ, স্বাধীন তদন্ত এবং সময়সীমাবদ্ধ সিদ্ধান্ত।

তথ্যসূত্র- পেট্রোবাংলা, বাপেক্স, এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার, ত্রিপুরা সরকারের জ্বালানি দপ্তর, ভারতের পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয়

ইকবাল মুন্না

সাংবাদিক ও নির্মাতা

ইকবাল মুন্নার দৃষ্টিপাত

নিয়মিত কলাম। রাঙামাটির খবর