বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে যখনই নতুন করে সংঘাত, সড়ক অবরোধ কিংবা সশস্ত্র তৎপরতার খবর আসে, তখনই জনমনে একটি প্রশ্ন ফিরে আসে—পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা এত কঠিন কেন? এর পেছনে কি কেবল স্থানীয় রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বিরোধ, নাকি বৃহত্তর কোনো স্বার্থও কাজ করছে? প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা অন্য কোনো বিদেশি শক্তি কি এই অস্থিরতাকে নিজেদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছে?

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে ২০২৬ সালের ২২ অক্টোবরের ঘটনা সেই প্রশ্নগুলো আবার সামনে এনেছে। অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধের প্রথম দিনেই উজোবাজার এলাকায় গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। প্রায় তিন হাজার পর্যটক নিরাপত্তা বাহিনীর পাহারায় সাজেক ছেড়ে খাগড়াছড়ির দিকে ফিরে যান। সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কিন্তু গোলাগুলির জন্য দায়ী কারা, কীভাবে পরিস্থিতি সংঘর্ষে রূপ নিল এবং সশস্ত্র ব্যক্তিদের পরিচয় কী—এসব প্রশ্নে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পরস্পরবিরোধী।

এই ঘটনাকে শুধু একটি সড়ক অবরোধ কিংবা আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখলে এর গভীরতা বোঝা যাবে না। সাজেকের সংকটের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিরোধ, আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ভূমি ও নিরাপত্তার প্রশ্ন, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা। তবে এসবের সঙ্গে বিদেশি শক্তির সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে কি না, সেটি আলাদা প্রশ্ন—যার উত্তর দিতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, অনুমান নয়।

২২ অক্টোবর সাজেকে কী ঘটেছিল?

সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারী অ্যাসোসিয়েশন ২২ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ভোর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক অবরোধ শুরু করে। তাদের প্রধান দাবিগুলোর একটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের কথিত সশস্ত্র সদস্যদের সাজেকের বিভিন্ন এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়া। সংগঠন দুটির অভিযোগ, এসব সশস্ত্র ব্যক্তির উপস্থিতিতে স্থানীয় বাসিন্দারা ভয়ভীতির মধ্যে রয়েছেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ও জুমচাষ ব্যাহত হচ্ছে।

অবরোধের কারণে সাজেকে অবস্থানরত পর্যটকেরা আটকা পড়েন। তাঁদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে সেনাবাহিনী ও পুলিশ নিরাপত্তা দিয়ে গাড়িবহর নিয়ে রওনা হয়। কিন্তু উজোবাজার এলাকায় অবরোধকারীরা যান চলাচলে বাধা দিলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে এবং পরে গোলাগুলির খবর আসে।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি চালায়। সেনাবাহিনী আত্মরক্ষা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাল্টা গুলি চালালে সশস্ত্র ব্যক্তিরা সরে যায়। আইএসপিআরের বিবৃতিতে গোলাগুলিতে প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহাম্মদ আবদুর রকিবও সংঘর্ষের কথা জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অবরোধকারীদের ইটপাটকেল নিক্ষেপে সেনাবাহিনীর চারজন এবং পুলিশের দুই সদস্য আহত হন। পুলিশ আরও জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা গোলাগুলির জন্য ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের দায়ী করছে।

কিন্তু ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির ঘটনা অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে এমন সংঘর্ষের সত্যতা পাওয়া যায়নি। তিনি আরও অভিযোগ করেছেন, শান্তিপূর্ণ অবরোধ ভেঙে দিতে নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ করেছে।

অর্থাৎ, আইএসপিআর ও পুলিশের বক্তব্য একদিকে; ইউপিডিএফের বক্তব্য অন্যদিকে। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে গোলাগুলির দায় নিয়ে স্বাধীন ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানা যায়নি। তাই কোনো পক্ষের বক্তব্যকে তদন্তে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত হবে না।

পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৯৩৩ পর্যটককে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমে জানানো হয়। জেলা প্রশাসনের পর্যটন নিষেধাজ্ঞাও বহাল ছিল। এদিকে ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ ২৪ অক্টোবর শনিবার রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সড়ক ও নৌপথে আধাবেলা অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ফলে সাজেকের সংকট এখন শুধু একটি এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব দুই জেলার যোগাযোগ, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অবরোধ কেন বারবার ফিরে আসছে?

সাজেকে বর্তমান অস্থিরতার তাৎক্ষণিক কারণ বোঝার জন্য অক্টোবরের ঘটনাপ্রবাহের দিকে তাকানো প্রয়োজন। স্থানীয় দুই সংগঠন ১১ অক্টোবর প্রথম দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু করে। প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর আশ্বাসের পর কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। দাবি পূরণ হয়নি—এমন অভিযোগ তুলে ১৫ অক্টোবর আবার অবরোধ শুরু হয়। পরে দুর্গাপূজা উপলক্ষে ১৬ থেকে ২১ অক্টোবর কর্মসূচি স্থগিত রাখা হয়। বিরতি শেষে ২২ অক্টোবর আবার অবরোধ শুরু হয়।

এই ধারাবাহিকতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার: স্থানীয় সংগঠনগুলোর অভিযোগ ও দাবির নিষ্পত্তি না হওয়ায় অবরোধের মতো কর্মসূচি বারবার ফিরে আসছে। প্রশাসন আশ্বাস দিয়েছে বলে আন্দোলন সাময়িকভাবে থেমেছে, কিন্তু অভিযোগের নিষ্পত্তি হয়েছে কি না, সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগ যাচাই করা হয়েছে কি না কিংবা স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ বোধ করছেন কি না—এসব বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকলে সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আন্দোলনকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সাজেকের মাচলং, থালকুম্বো, চিল্ল্যাতুলি কুঠি, নোয়াপাড়া, লাম্বাবাক ও ভূয়াছড়িসহ কয়েকটি এলাকায় জেএসএসের সন্তু লারমা নেতৃত্বাধীন অংশের সশস্ত্র সদস্যরা অবস্থান করছেন। তাদের দাবি, স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে, কিছু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন এবং জুমচাষিরা জমিতে যেতে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

এসব অভিযোগের প্রতিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রশাসনের দায়িত্ব হলো, অভিযোগগুলোকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে উপেক্ষা না করে সুনির্দিষ্ট তদন্ত করা। কোথায় কারা অবস্থান করছে, কোনো বেআইনি অস্ত্র রয়েছে কি না, ভয়ভীতি প্রদর্শন বা চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা জরুরি।

দায়ী কারা—জেএসএস,ইউপিডিএফ,নাকি অন্য কেউ?

সাজেকের সাম্প্রতিক ঘটনার দায় নির্ধারণ করতে হলে তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখতে হবে: অবরোধ আয়োজনের পেছনের কারণ, অবরোধের সময় সংঘটিত সহিংসতা এবং গোলাগুলিতে অংশ নেওয়া সশস্ত্র ব্যক্তিদের পরিচয়। এই তিনটি বিষয়ের জন্য একই পক্ষ দায়ী—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।

অবরোধকারী সংগঠনগুলো বলছে, তাদের আন্দোলনের উদ্দেশ্য স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কথিত সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া। তাদের দাবি, প্রশাসন প্রতিশ্রুতি দিয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। এ অবস্থায় তারা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, আইএসপিআর ও পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, গোলাগুলিতে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা জড়িত ছিল। ইউপিডিএফ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আবার সংবাদমাধ্যমে জেএসএসের বক্তব্যও এসেছে, যেখানে সংগঠনটি স্থানীয় আন্দোলনের পেছনে ইউপিডিএফের প্রভাব থাকার অভিযোগ তুলেছে। অর্থাৎ এখানে শুধু নিরাপত্তা বাহিনী ও একটি সংগঠনের বিরোধ নয়; আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাসও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

এই অবস্থায় কোনো একটি সংগঠনকে পুরো ঘটনার জন্য দায়ী ঘোষণা করা দায়িত্বশীল হবে না। যদি তদন্তে প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনো সংগঠনের সদস্য গুলি চালিয়েছেন,অবরোধকারীদের ভয় দেখিয়েছেন কিংবা বেসামরিক মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছেন, তাহলে পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান নির্বিশেষে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। একইভাবে,নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠলে সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের আওতায় আসা উচিত।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক দাবি ন্যায্য কি না, আর সেই সংগঠনের কেউ সহিংসতায় জড়িত কি না—এগুলো পৃথক প্রশ্ন।স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপত্তার দাবিকে প্রমাণ ছাড়াই কোনো সংগঠনের ষড়যন্ত্র বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি নিরাপত্তার দাবি তুলে সংঘটিত সম্ভাব্য বেআইনি কর্মকাণ্ডকেও উপেক্ষা করা যায় না।

পাহাড়ের সংঘাতের মূল শিকড় কোথায়?

সাজেকের অস্থিরতার ব্যাখ্যা শুধু বর্তমান অবরোধে খুঁজলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংঘাতের ঐতিহাসিক শিকড় রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়, ভূমির অধিকার, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা, উন্নয়নের বণ্টন এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সম্পর্কের মধ্যে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কয়েক দশকের সশস্ত্র সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক সমাধানের পথ তৈরি করাই ছিল এর প্রধান উদ্দেশ্য। চুক্তির মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর ভূমিকা, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, পুনর্বাসন এবং স্থানীয় প্রশাসনে ক্ষমতা হস্তান্তরসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও এর পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতবিরোধ রয়েছে। সরকার ২০২৪ সালে জাতিসংঘের একটি ফোরামে জানিয়েছিল, চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৬৫টি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়েছে, তিনটি আংশিকভাবে বাস্তবায়িত এবং চারটি বাস্তবায়নাধীন। অন্যদিকে, আঞ্চলিক সংগঠন ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের বক্তব্যে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানে কার্যকর ক্ষমতা হস্তান্তর এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কিছু বিধান বাস্তবায়নে ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় পার্বত্য চট্টগ্রামে বারবার নিরাপত্তা সংকট ফিরে আসার পেছনে পাঁচটি বড় বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছেঃঅঞ্চলের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক বাস্তবতা,পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি, জটিল ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ,নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং ভূরাজনৈতিক প্রভাব। গবেষণাটির মূল বক্তব্য হলো,এসব কারণ আলাদা নয়; একটির সঙ্গে অন্যটি জড়িয়ে রয়েছে।

এখানেই সাজেকের সংকটের বৃহত্তর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যখন ভূমিবিরোধের নিষ্পত্তি দেরি হয়,স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষমতা নিয়ে অস্পষ্টতা থাকে,বিভিন্ন সংগঠনের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয় এবং নিরাপত্তার অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার পাওয়া যায় না,তখন একটি স্থানীয় ঘটনাও বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের রূপ নিতে পারে।

সুতরাং সাজেকের অস্থিরতা শুধু কয়েকটি সশস্ত্র ব্যক্তিকে সরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন নয়।সেই ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য যে সমস্যাগুলো বারবার নতুন সংকট তৈরি করে,সেগুলোরও সমাধান জরুরি।

জেএসএস ও ইউপিডিএফের বিরোধ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতি বুঝতে গেলে জেএসএস ও ইউপিডিএফের ঐতি হাসিক সম্পর্ক ও মতপার্থক্যের দিকে তাকাতে হয়। উভয় সংগঠনই পাহাড়ি জন গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অধিকার ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে। তবে ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়।

শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরকারী সংগঠন জেএসএস চুক্তিকে রাজনৈতিক সমাধানের একটি কাঠামো হিসেবে গ্রহণ করে। ইউপিডিএফ চুক্তির বিভিন্ন দিকের বিরোধিতা করে আলাদা রাজনৈতিক অবস্থান নেয়।এর ফলে পাহাড়ের আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়,যা পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মাধ্যমে আরও জটিল হয়েছে।

পরবর্তী সময়ে জেএসএস ও ইউপিডিএফের বিভিন্ন অংশ এবং অন্য আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যেও বিভাজন তৈরি হয়। এসব সংগঠনের রাজনৈতিক নেতৃত্ব,স্থানীয় প্রভাব, সাংগঠনিক উপস্থিতি ও অস্ত্রধারী সদস্যদের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে। বিআইআইএসএসের গবেষণায়ও পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিভাজন, সশস্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

তবে কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক ইতিহাস জানলেই সাম্প্রতিক গোলাগুলির দায় তার ওপর চাপানো যায় না। গত ২২ অক্টোবরের ঘটনার ক্ষেত্রে কারা গুলি চালিয়েছে, তাদের সাংগঠনিক পরিচয় কী এবং অবরোধের মধ্যে সহিংসতা কীভাবে শুরু হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর ঘটনাস্থলের প্রমাণ ও নিরপেক্ষ তদন্ত থেকে আসতে হবে। সামগ্রিকভাবে,আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও তা একমাত্র কারণ নয়। ভূমি, স্থানীয় প্রশাসন, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের সমস্যাগুলোও সংঘাতকে টিকিয়ে রাখে।

ভারতের ইন্ধন আছে কি? ইতিহাস কী বলে,বর্তমানের প্রমাণ কী?

সাজেকের অস্থিরতার পেছনে ভারতের ইন্ধন রয়েছে কি না—এই প্রশ্নকে আবেগের পরিবর্তে ইতিহাস,ভূগোল ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। পার্বত্য চট্টগ্রা মের অবস্থান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এই এলাকার সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং মিয়ানমারের সীমান্ত রয়েছে। দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, সীমান্তপথ এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সামাজিক সম্পর্কের কারণে অঞ্চলটি ঐতিহাসিকভাবেই নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক আলোচনার অংশ।

ভারতের ভূমিকা নিয়ে সন্দেহের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী দশকগুলোতে পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন শান্তিবাহিনীর নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন চলছিল, তখন বিভিন্ন গবেষণা ও ঐতিহাসিক বিবরণে ভারতের ত্রিপুরা অঞ্চলে শান্তিবাহিনীর আশ্রয়, ঘাঁটি, প্রশিক্ষণ ও সহায়তা পাওয়ার দাবি উঠে এসেছে। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে প্রকাশিত গবেষণা এবং দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন গবেষকের লেখায় ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের টানাপোড়েনের সঙ্গে এই সংঘাতের সম্পর্ক আলোচনা করা হয়েছে।

তবে ঐতিহাসিক ঘটনাকে বর্তমানের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অতীতে কোনো রাষ্ট্র কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সহায়তা করে থাকলে, তা থেকে কয়েক দশক পর একই রাষ্ট্র সাজেকের বর্তমান অস্থিরতা পরিচালনা করছে—এমন সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। বর্তমানের কোনো ঘটনার পেছনে বিদেশি রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ ভূমিকা প্রমাণ করতে হলে বর্তমান সময়ের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

এ পর্যন্ত ২২ অক্টোবরের গোলাগুলি কিংবা সাজেকের চলমান অবরোধের পেছনে ভারত সরকারের প্রত্যক্ষ নির্দেশ, অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ বা সংগঠিত সহায়তার নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। একইভাবে, অন্য কোনো বৃহৎ শক্তি এই নির্দিষ্ট ঘটনাকে পরিকল্পিতভাবে উসকে দিয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো যাচাই করা তথ্যও সামনে আসেনি।

এর মানে এই নয় যে বিদেশি হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না। সীমান্তবর্তী কৌশলগত অঞ্চলে অস্ত্র চোরাচালান, আন্তসীমান্ত যোগাযোগ, অবৈধ অর্থায়ন কিংবা বিদেশি পক্ষের রাজনৈতিক প্রভাবের চেষ্টা থাকলে তা জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু এসব সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে নির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে। সীমান্তে কোনো গোষ্ঠীর উপস্থিতি, বিদেশি রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ কিংবা অতীতের সম্পর্ক—এসব একা বর্তমানের ষড়যন্ত্র প্রমাণ করে না।

সঠিক অনুসন্ধানে অন্তত কয়েকটি বিষয় দেখা প্রয়োজনঃসশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থের উৎস কী,অস্ত্র কোথা থেকে এসেছে,কোনো সীমান্তপথ ব্যবহার করা হয়েছে কি না,গ্রেপ্তার বা জব্দ করা ব্যক্তিদের যোগাযোগে বিদেশি সংযোগের প্রমাণ রয়েছে কি না এবং গোয়েন্দা তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব কি না। এ ধরনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিদেশি সম্পৃক্ততার প্রশ্ন আরও নির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন করা যাবে।

অতএব, ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে গবেষণাভিত্তিক আলোচনা করার ভিত্তি আছে, কিন্তু সাজেকের বর্তমান অস্থিরতায় ভারতের ইন্ধন রয়েছে—এ দাবি এখনো প্রমাণিত নয়। এই পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। কারণ, প্রমাণ ছাড়া কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে দায়ী করলে প্রকৃত অপরাধী বা স্থানীয় সমস্যার কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে, পাশাপাশি কূটনৈতিক উত্তেজনাও তৈরি হতে পারে।

বৃহৎ শক্তির স্বার্থ কি পাহাড়ের অস্থিরতায় ভূমিকা রাখতে পারে?

ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুরুত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্ত, বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি অবস্থান, ভারত ও মিয়ানমারের সংযোগস্থল এবং পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি—সব মিলিয়ে অঞ্চলটি নিরাপত্তা ও যোগাযোগের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। সীমান্তের ওপারে সংঘাত, অস্ত্রের চলাচল কিংবা প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি পার্বত্য অঞ্চলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

কিন্তু একটি অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব আছে বলেই সেখানে প্রতিটি অস্থিরতার নেপথ্যে কোনো বৃহৎ শক্তি রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের স্বার্থ বিবেচনা করে—এটি স্বাভাবিক। তবে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় তারা ইন্ধন দিয়েছে কি না, সেটি আলাদা এবং প্রমাণনির্ভর প্রশ্ন।

একটি বিদেশি রাষ্ট্র স্থানীয় কোনো সংঘাত থেকে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে—এটি সম্ভাব্য বিশ্লেষণ। কিন্তু সম্ভাব্য সুবিধা পাওয়া আর সংঘাতটি নিজেই সৃষ্টি করা এক বিষয় নয়। এই পার্থক্য না রাখলে প্রতিটি অস্থিরতার ব্যাখ্যা ষড়যন্ত্রের দিকে চলে যায়, অথচ স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রশাসনিক দুর্বলতা, ভূমিবিরোধ কিংবা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব স্বার্থ যথাযথভাবে তদন্ত করা হয় না।

জাতীয় নিরাপত্তার জন্য তাই দুটি দিক একসঙ্গে বিবেচনা করা দরকারঃএকদিকে সম্ভাব্য বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকা,অন্যদিকে দেশের ভেতরের সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করা। স্থানীয় সমস্যার সমাধান যত দুর্বল হবে, বাইরে থেকে কোনো পক্ষ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে পারে—এটি একটি যুক্তিসংগত ঝুঁকি। কিন্তু সেই ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায় হলো কার্যকর শাসন,স্থানীয় মানুষের আস্থা, নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান।

পর্যটন ও অর্থনৈতিক স্বার্থঃ অস্থিরতার আরেকটি মাত্রা-

সাজেক এখন বাংলাদেশের পরিচিত পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি। পর্যটনকে কেন্দ্র করে রিসোর্ট, কটেজ, পরিবহন, খাবারের দোকান, স্থানীয় বাজার এবং নানা ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠেছে। ফলে সড়ক অবরোধ বা নিরাপত্তা সংকট শুধু পর্যটকদের যাতায়াত ব্যাহত করে না; স্থানীয় মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও পণ্য পরিবহনেও প্রভাব ফেলে।

স্থানীয় সংগঠনগুলোর অভিযোগ, সশস্ত্র উপস্থিতির কারণে কিছু বাসিন্দা ঘরবাড়ি ছেড়েছেন এবং জুমচাষিরা জমিতে যেতে পারছেন না। এসব অভিযোগ সত্য হলে তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতির ওপর সরাসরি পড়ে। একই সঙ্গে পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ থাকলে রিসোর্টকর্মী, গাড়িচালক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পণ্য সরবরাহকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।

পর্যটন অর্থনীতির বিস্তার ভূমির মূল্য, জমির ব্যবহার ও স্থানীয় প্রভাবের প্রশ্নকেও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে। কিন্তু ২২ অক্টোবরের গোলাগুলি বা অবরোধের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট পর্যটন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী কিংবা অর্থনৈতিক স্বার্থ কাজ করেছে—এমন সিদ্ধান্তের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ নেই। তাই পর্যটনকে সম্ভাব্য কাঠামোগত স্বার্থের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কিন্তু বর্তমান সংঘাতের সরাসরি কারণ হিসেবে ঘোষণা করা যায় না।

প্রশাসনের ব্যর্থতা কোথায়?

সাজেকের সংকটের ক্ষেত্রে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম অবরোধের পর আন্দোলনকারীদের দাবি পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল বলে সংগঠনগুলো জানিয়েছে। কিন্তু তারা দাবি পূরণ হয়নি বলে আবার অবরোধ শুরু করেছে। যদি সশস্ত্র উপস্থিতি ও স্থানীয়দের ভয়ভীতির অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে তা নিষ্পত্তি করতে না পারা প্রশাসনের সক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে।

এখানে প্রশাসনের সামনে দুটি সমান্তরাল দায়িত্ব রয়েছে। একদিকে পর্যটক, স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবহনকর্মী ও জরুরি সেবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; অন্যদিকে সশস্ত্র উপস্থিতি, হুমকি, চাঁদাবাজি কিংবা সহিংসতার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা। কোনো গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তাকে ছাড় দেওয়া যাবে না, আবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধীও বলা যাবে না।

অবরোধকারীদেরও দায়িত্ব রয়েছে। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ একটি রাজনৈতিক অধিকার হলেও, জরুরি যাতায়াত বন্ধ রাখা, পর্যটক বা স্থানীয় মানুষকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা এবং সহিংসতার আশঙ্কা বাড়ানো জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আন্দোলনের কারণে অ্যাম্বুলেন্স, জরুরি ওষুধ, অগ্নিনির্বাপণ বা অন্য জরুরি সেবা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হবে যদি পরিস্থিতি শান্ত করতে শুধু আশ্বাস দেওয়া হয়, কিন্তু অভিযোগের তদন্ত, সশস্ত্র ব্যক্তিদের পরিচয় নির্ধারণ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকে। নিয়মিত অগ্রগতির তথ্য প্রকাশ করলে স্থানীয় মানুষ বুঝতে পারবেন, তাঁদের অভিযোগের ভিত্তিতে বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এখন রাষ্ট্রের করণীয় কী?

প্রথমত, ২২ অক্টোবরের গোলাগুলির বিষয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা গুলির খোসা, অস্ত্রের ধরন, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং অন্য ফরেনসিক প্রমাণ সংরক্ষণ করা জরুরি। আইএসপিআর, পুলিশ ও ইউপিডিএফের বক্তব্যের মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, স্থানীয় মানুষের নিরাপত্তার দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে অভিযোগের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা মূল্যায়ন করতে হবে। যাঁরা হুমকি বা বাস্তুচ্যুতির শিকার হয়েছেন বলে দাবি করছেন, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা প্রয়োজন। কারা দায়ী, কী ধরনের অপরাধ ঘটেছে এবং কোথায় নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে।

তৃতীয়ত, আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রশাসন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কার্বারী, হেডম্যান, নাগরিক সমাজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আলোচনা যথেষ্ট নয়; যাঁদের জীবন ও জীবিকা সরাসরি প্রভাবিত হচ্ছে, তাঁদেরও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ দিতে হবে।

চতুর্থত, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার পাশাপাশি সম্ভাব্য বিদেশি অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ কিংবা আন্তসীমান্ত যোগাযোগের অভিযোগ থাকলে তা গোয়েন্দা ও আইনগত প্রক্রিয়ায় যাচাই করতে হবে। তবে এই উদ্যোগ যেন কোনো জনগোষ্ঠী বা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে নির্বিচার সন্দেহ কিংবা হয়রানির কারণ না হয়। প্রমাণভিত্তিক তদন্তই জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ।

পঞ্চমত, ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন, ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা এবং নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর অগ্রগতি নিয়ে সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করা প্রয়োজন। একটি অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি শুধু নিরাপত্তা অভিযান দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না; তার জন্য কার্যকর প্রশাসন, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের শাসন এবং ন্যায়সংগত উন্নয়নও প্রয়োজন।

উপসংহার: ষড়যন্ত্রের সন্দেহ নয়, প্রমাণ ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি

সাজেকের বর্তমান অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুতর সতর্কবার্তা। কারণ, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে যদি বারবার অবরোধ, গোলাগুলি এবং পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মুখে পড়তে হয়, তাহলে তা শুধু পর্যটনশিল্পের ক্ষতি নয়; স্থানীয় জনগণের আস্থা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

এই সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বিরোধ, সশস্ত্র উপস্থিতির অভিযোগ, প্রশাসনের আশ্বাস বাস্তবায়ন নিয়ে অসন্তোষ এবং অবরোধ ঘিরে সংঘর্ষ। এর গভীরে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিভাজন, ভূমি ও পরিচয়ের প্রশ্ন, শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা।

ভারতের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে গবেষণা রয়েছে, বিশেষত শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র আন্দোলনের সময়কার আঞ্চলিক রাজনীতিতে। কিন্তু সেই ইতিহাসকে ব্যবহার করে ২০২৬ সালের সাজেকের সংঘাতে ভারতের সরাসরি ইন্ধন রয়েছে বলে ঘোষণা করার মতো নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য প্রমাণ এখনো নেই। বৃহত্তর কোনো শক্তি অস্থিরতাকে কাজে লাগাতে পারে—এ সম্ভাবনাকে নিরাপত্তা বিশ্লেষণে বিবেচনা করা যায়; তবে সম্ভাবনাকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রচার করলে তদন্তের পথ সংকুচিত হয়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অবস্থান হবে—কোনো সন্দেহকে অগ্রাহ্য না করে প্রতিটি অভিযোগ তদন্ত করা, আবার প্রমাণ ছাড়া কাউকে দায়ী না করা। একই সঙ্গে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, ভূমির অধিকার, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা পরস্পরবিরোধী লক্ষ্য নয়; বরং টেকসই শান্তির জন্য দুটিই প্রয়োজন।

সাজেকের অস্থিরতার পেছনে বিদেশি ইন্ধন আছে কি না, তার চূড়ান্ত উত্তর তদন্তই দিতে পারে। কিন্তু স্থানীয় সংঘাত, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও রাজ নৈতিক বিভাজনকে অমীমাংসিত রেখে শুধু বিদেশি ষড়যন্ত্রের কথা বললে সমস্যার মূল কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন প্রমাণভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং এমন রাজনৈতিক সমাধান, যেখানে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রভাব নয়—সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকারই হবে রাষ্ট্রের প্রধান বিবেচনা।

ইকবাল মুন্না

সাংবাদিক ও নির্মাতা