ইয়েমেনের হুতিদের সামরিকভাবে পরাজিত করা যাবে কি না, সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে তাদের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা কতটা বাস্তব—এই তিনটি প্রশ্ন এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা আলোচনার কেন্দ্রে। এর মধ্যেই ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর সাবেক প্রধান স্যার জন সাওয়ারের একটি বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত ১৯ থেকে ২১ অক্টোবর কাতারের দোহায় অনুষ্ঠিত গ্লোবাল সিকিউরিটি ফোরামে তিনি বলেছেন, “হুতিরা টিকে থাকবে। তাদের পরাজিত করা যাবে না।” তাঁর ভাষ্য, ভবিষ্যতের দীর্ঘ সময়জুড়ে ইয়েমেনের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাওয়ার শুধু একজন সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান নন;তিনি ব্রিটিশ পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন বিশ্লেষক। তবে তাঁর বক্তব্যকে হুতিদের অপরাজেয় হওয়ার নিশ্চিত প্রমাণ বা সৌদি আরবের পতনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। বরং এটি এমন একটি বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে,যা গত এক দশকের ইয়েমেন যুদ্ধ বারবার সামনে এনেছেঃ সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেই একটি সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলনকে নির্মূল করা যায় না।
এখন প্রশ্ন হলো, হুতিদের পরাজিত করা কঠিন কেন? সৌদি আরবের ভেতরে তাদের প্রভাব বিস্তারের বাস্তব সম্ভাবনা কতটা? আর ইয়েমেনের সংঘাত ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিলে তার পরিণতি কী হতে পারে?
হুতিদের পরাজিত করা এত কঠিন কেন?
ইয়েমেনের হুতিরা,যারা আনসার আল্লাহ নামেও পরিচিত,কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী নয়। তাদের রাজনৈতিক,সামরিক ও সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। ২০১৪ সালে রাজধানী সানাসহ দেশের বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে তারা ইয়েমেনের রাজনীতি ও নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে টিকে আছে। সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দীর্ঘ অভিযান,যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সামরিক পদক্ষেপ এবং বিভিন্ন পর্যায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাদের পুরোপুরি উৎখাত করা যায়নি।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই জন সাওয়ার মনে করেন, হুতিদের সামরিকভাবে পরাজিত করা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নয়। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য এখানেই—ইয়েমেনের সংঘাতের সমাধান শুধু বিমান হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ কিংবা সামরিক অবরোধের মাধ্যমে সম্ভব হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
হুতিদের শক্তির কয়েকটি উৎস রয়েছে।প্রথমত,ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে তাদের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক উপস্থিতিও স্থানীয় নেটওয়ার্ক আছে। দ্বিতীয়ত,দীর্ঘ যুদ্ধ তাদের সামরিক অভিজ্ঞতা বাড়িয়েছে। তৃতীয়ত,ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা তাদের নিজেদের সীমানার বাইরে থেকেও প্রতিপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় চাপ তৈরির সুযোগ দিয়েছে। চতুর্থত,ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিভাজন এবং প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাব তাদের টিকে থাকার ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে হুতিদের শক্তি সীমাহীন কিংবা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে সবাই তাদের সমর্থক। ইয়েমেনের বিভিন্ন গোত্র, রাজনৈ তিক শক্তি ও আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেও অসন্তোষের খবর এসেছে। ফলে হুতিদের সামরিকভাবে দুর্বল করা, তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকার পরিধি সংকুচিত করা এবং তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা—এই তিনটি আলাদা বিষয়। সাওয়ারের বক্তব্য মূলত শেষের বিষয়টি নিয়েই।একটি সংগঠনকে দুর্বল করা সম্ভব হলেও তাকে পুরোপুরি নির্মূল করতে না পারার অভিজ্ঞতা ইয়েমেনেই শুধু নয়, ইরাক ও আফগানিস্তানের দীর্ঘ যুদ্ধেও দেখা গেছে।
সৌদি আরবের জন্য কেন বাড়ছে চাপ?
ইয়েমেনের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। দুই দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক, সামাজিক ও গোত্রীয় সম্পর্কও জটিল। কিন্তু সেই সম্পর্ককে সরলভাবে এমনভাবে দেখা উচিত নয় যে সীমান্তবর্তী এলাকার গোত্রগুলো একত্র হলেই সৌদি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়বে। গোত্রীয় আনুগত্য, রাজনৈতিক স্বার্থ, ধর্মীয় পরিচয়, রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক ও স্থানীয় নিরাপত্তার হিসাব—সব মিলিয়েই এসব অঞ্চলের মানুষের অবস্থান নির্ধারিত হয়।
তবু সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে সৌদি আরবের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে। কারণ, সীমান্তের নিরাপত্তা বজায় রাখা শুধু সামরিক ঘাঁটি রক্ষার বিষয় নয়;গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর, বেসামরিক অবকাঠামো এবং মানুষের স্বাভাবিক জীবনও নিরাপদ রাখতে হয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে সৌদি আরবের বিমান চলাচল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। অক্টোবরের দ্বিতীয় সপ্তাহে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলা ও নিরাপত্তাঝুঁকির পর কার্যক্রম বন্ধ এবং পুনরায় চালুর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরবের কয়েকটি রুটে ফ্লাইট স্থগিত বা পিছিয়ে দেয়। ২০ অক্টোবর রয়টার্সও জানায়, হামলার পর একাধিক আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরবগামী ফ্লাইটে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এর প্রভাব বাংলাদেশের যাত্রীদের ওপরও পড়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ১৭ অক্টোবর রিয়াদগামী ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয়। তবে এর অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের সব বিমানবন্দর বন্ধ ছিল, কিংবা বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে সব ধরনের ফ্লাইট পুরো অক্টোবরজুড়ে বাতিল ছিল। বিমান জানিয়েছিল,জেদ্দা ও মদিনাগামী ফ্লাইট চালু রয়েছে; দাম্মাম রুট পুনরায় চালুর বিষয়টি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
এই ঘটনাগুলো থেকে বোঝা যায়, সংঘাতের প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না। একটি বিমানবন্দরে হামলা বা নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজ চলাচল,প্রবাসী শ্রমিকদের যাতায়াত, বাণিজ্য এবং পর্যটনেও বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে। সৌদি আরবের অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য তাই বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজনঃকোনো লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হওয়া,প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করা এবং প্রতিটি হামলায় লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস হওয়া এক বিষয় নয়। হুতিদের সক্ষমতা মূল্যায়ন করতে হলে হামলার সংখ্যা নয়,বরং স্বাধীনভাবে যাচাই করা ক্ষয়ক্ষতি, প্রতিরোধের সাফল্য এবং পরবর্তী সামরিক প্রতিক্রিয়াও বিবেচনায় নিতে হবে।
নাজরান নিয়ে পেপে এস্কোবারের দাবি: কতটা নিশ্চিত?
ব্রাজিলীয় সাংবাদিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক পেপে এস্কোবার দাবি করেছেন, সৌদি আরবের নাজরান অঞ্চলের কিছু গোত্রীয় নেতা ইয়েমেনের রাজধানী সানায় গিয়ে হুতিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ওই নেতারা হুতিদের নাজরানে প্রবেশ করলে স্বাগত জানানোর বার্তাও দিয়েছেন।
দাবিটি সত্য হলে তা সৌদি আরবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে রাজনৈতিক ও গোত্রীয় সমীকরণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু এমন একটি সংবেদনশীল দাবির ক্ষেত্রে শুধু একজন বিশ্লেষকের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। বৈঠকে কারা ছিলেন, কখন বৈঠক হয়েছে, অংশগ্রহণকারীদের পরিচয় কী এবং তাঁদের বক্তব্যের স্বাধীন প্রমাণ আছে কি না—এসব তথ্য প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য স্বাধীন সূত্রে এই নির্দিষ্ট বৈঠক ও কথিত বার্তার সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি। তাই এটিকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা নয়, বরং যাচাই প্রয়োজন এমন একটি দাবি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
নাজরান সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের একটি সীমান্তবর্তী প্রদেশ। ইয়েমেনের সঙ্গে এর ঐতিহাসিক ও সামাজিক সম্পর্ক রয়েছে। এই অঞ্চলের গোত্রীয় সম্পর্ককে ঘিরে রাজনীতি ও নিরাপত্তার প্রশ্নও নতুন নয়। কিন্তু ইতিহাসে কোনো অঞ্চলের সঙ্গে ইয়েমেনের সম্পর্ক থাকলেই বর্তমান সৌদি ভূখণ্ডের বাসিন্দারা হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রাকে সমর্থন করবেন, এমন সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
ইয়েমেনের গোত্রগুলোও একক কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়। আল জাজিরার ৮অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্লেষণে দেখা যায়,হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গোত্রীয় সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হলেও বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অবিশ্বাস,স্বার্থের সংঘাত ও নেতৃত্বের বিভাজন একটি ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার পথে বাধা হয়ে আছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিনের সংঘাতে হুতিদের সামরিক সক্ষমতা এমন এক অবস্থান তৈরি করেছে,যেখানে অনেক প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠী সরাসরি সংঘাতে যাওয়ার আগে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও শক্তির ভারসাম্য বিবেচনা করে।
অর্থাৎ, গোত্রীয় নেতাদের ঐক্য কোনো সংঘাতের গতিপথ বদলে দিতে পারে; কিন্তু সেই ঐক্য তৈরি হয়েছে কি না, তারা কাকে সমর্থন করবে এবং তাদের অবস্থান সামরিক পরিস্থিতিতে কতটা প্রভাব ফেলবে—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া সৌদি আরবের কোনো অঞ্চল হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া দায়িত্বশীল বিশ্লেষণ হবে না।
ইরাকের অভিজ্ঞতা থেকে কী শেখা যায়?
সাবেক মার্কিন মেরিন কর্মকর্তা ম্যাথিউ হোসহ বিভিন্ন যুদ্ধবিষয়ক বিশ্লেষক গোত্রীয় নেতাদের ঐক্যের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। ইরাক ও আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার: স্থানীয় সমাজের রাজনৈতিক সমর্থন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সাফল্য ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
বিদেশি সামরিক বাহিনী কোনো অঞ্চলে শক্তিশালী অস্ত্র, উন্নত প্রযুক্তি ও আকাশপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমঝোতা তৈরি করা ভিন্ন ধরনের কাজ। এগুলো কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না।
তবে ইরাকের অভিজ্ঞতাকে ইয়েমেন বা সৌদি আরবের পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখাও ঠিক হবে না। প্রতিটি দেশের ইতিহাস, গোত্রীয় কাঠামো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং আঞ্চলিক শক্তির সম্পর্ক আলাদা। গোত্রীয় নেতারা ঐক্যবদ্ধ হলেই তাঁদের পরাজিত করা অসম্ভব হয়ে পড়ে—এমন কোনো সর্বজনীন নিয়ম নেই।ঐক্য সামরিক শক্তি বাড়াতে পারে,কিন্তু নেতৃত্বের বিভাজন, রসদ, অস্ত্র, অর্থায়ন ও রাজনৈতিক লক্ষ্যও ফলাফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। ইয়েমেনে হুতিদের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির ব্যাখ্যা তাই কেবল গোত্রীয় ঐক্য দিয়ে করা যাবে না। তাদের নিজস্ব সংগঠন, স্থানীয় নিয়ন্ত্রণ, সামরিক সক্ষমতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের দুর্বলতাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক: প্রভাব আছে, কিন্তু সম্পর্কটি একমাত্রিক নয়
ইয়েমেনের সংঘাতকে প্রায়ই ইরান ও সৌদি আরবের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখা হয়। ইরানের সঙ্গে হুতিদের সম্পর্ক, তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির প্রশ্ন এই আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। তবে হুতিদের কেবল ইরানের নির্দেশে পরিচালিত একটি বাহিনী হিসেবে বর্ণনা করলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও তাদের নিজস্ব স্বার্থের দিকটি আড়ালে পড়ে যায়। হুতিদের নিজস্ব নেতৃত্ব, রাজনৈতিক লক্ষ্য এবং ইয়েমেনের ক্ষমতার কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান রয়েছে। ইরানের সমর্থন তাদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি ও স্থানীয় ক্ষমতার সম্পর্কও তাদের টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
এ কারণে সৌদি আরব ও হুতিদের সংঘাতকে শুধু সৌদি আরব বনাম ইরান হিসেবে দেখলে পূর্ণ চিত্র পাওয়া যাবে না। এখানে ইয়েমেনের ভেতরের রাজনৈতিক বিভাজন, রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতা, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং আন্তর্জাতিক শক্তির সামরিক ভূমিকা—সবকিছুই বিবেচনায় নিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে নতুন সংঘাত কি আসন্ন?
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু যুদ্ধের আশঙ্কা, সামরিক প্রস্তুতি এবং যুদ্ধ শুরু হওয়ার নিশ্চিত সিদ্ধান্ত—এগুলো এক নয়। কোনো বিশ্লেষক যুদ্ধ আসন্ন বলে মন্তব্য করলেই তা সরকারি সিদ্ধান্ত বা গোয়েন্দা তথ্যের নিশ্চিত প্রমাণ হয়ে যায় না।
জনসাওয়ারের বক্তব্যের মতোই বিভিন্ন বিশ্লেষকের মন্তব্য পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু তাঁদের মন্তব্যকে মূল্যায়ন করতে হবে বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট, তাঁদের ব্যবহৃত তথ্য এবং অন্যান্য স্বাধীন প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটা ভিডিও, অসম্পূর্ণ অনুবাদ কিংবা উৎসহীন উদ্ধৃতি দিয়ে যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবে ঘোষণা করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক কর্মীদের পরিবারকে পশ্চিম এশিয়ার সব মার্কিন দূতাবাস থেকে অবিলম্বে সরিয়ে নেওয়ার নতুন নির্দেশ জারি হয়েছে—এমন দাবিও যাচাই করা প্রয়োজন। এর আগে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েকটি দেশে মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্য ও অপ্রয়োজনীয় কর্মীদের চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের আগস্টে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে দেখা যায়, অঞ্চলটির কয়েকটি মার্কিন দূতাবাসে কর্মীদের পরিবারের সদস্যদের ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল। ফলে ২২ অক্টোবর সব পশ্চিম এশীয় দূতাবাসের পরিবারের সদস্যদের নতুন করে অবিলম্বে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এমন দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য সরকারি ঘোষণা বা স্পষ্ট প্রতিবেদন নিশ্চিত করা যায়নি।
নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হলে সেটি গুরুতর বিষয়, কিন্তু তা থেকে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল খুব শিগগিরই ইরানে হামলা করতে যাচ্ছে। এমন সিদ্ধান্তের জন্য সরকারি বিবৃতি, সামরিক মোতায়েন, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং অন্যান্য যাচাইযোগ্য তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে উপসাগরীয় দেশগুলোর সামনে কী সংকট তৈরি হবে?
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তার প্রভাব শুধু যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোও নিরাপত্তা, বাণিজ্য এবং জ্বালানি রপ্তানি নিয়ে বড় চাপের মুখে পড়তে পারে।
এই দেশগুলোর ভূরাজনৈতিক অবস্থান এক নয়। কেউ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখে, কেউ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালায়, আবার কেউ একই সঙ্গে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা করে। তাই সব উপসাগরীয় দেশ একই অবস্থান নেবে কিংবা যুদ্ধের ক্ষেত্রে একইভাবে জড়িয়ে পড়বে—এমন ধরে নেওয়া ভুল হবে।
যুদ্ধ বড় আকার ধারণ করলে সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে থাকবে জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন, বিমান চলাচলে বিধিনিষেধ, বীমা ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল ও পণ্যের দামেও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশকে ধ্বংস করে দেবে কিংবা উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো অনিবার্যভাবে ভেঙে পড়বে—এ ধরনের বক্তব্যকে সামরিক বাস্তবতার নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে নেওয়া যায় না। যুদ্ধের ফল নির্ভর করে প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, আঞ্চলিক জোট, কূটনৈতিক সমঝোতা এবং সংঘাত কতটা বিস্তৃত হচ্ছে তার ওপর।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ভুল হিসাব। কোনো হামলায় বেসামরিক মানুষ হতাহত হলে বা বেসামরিক বিমান চলাচলে বিপদ তৈরি হলে প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের চাপ বাড়তে পারে। একটি সীমিত সামরিক সংঘাত এভাবেই বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটে পরিণত হতে পারে। তাই যুদ্ধের ঝুঁকি মূল্যায়নের সময় উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের পাশাপাশি বাস্তব সামরিক পদক্ষেপ এবং সংঘাত থামানোর কূটনৈতিক পথও দেখতে হবে।
প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে?
পেপে এস্কোবারের নামে প্রচারিত আরেকটি দাবি হলো, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে প্রিন্স মোহাম্মদ বিন নায়েফকে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা করছে। দাবিটির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এটিকে প্রতিষ্ঠিত গোয়েন্দা পরিকল্পনা হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
মোহাম্মদ বিন নায়েফ সৌদি আরবের রাজপরিবারের সদস্য এবং ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্রাউন প্রিন্স ছিলেন। ২০১৭ সালে তাঁকে সরিয়ে মোহাম্মদ বিন সালমানকে ক্রাউন প্রিন্স করা হয়। এরপর থেকে সৌদি রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য ও উত্তরাধিকার নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু অতীতের এই ঘটনা থেকে সিআইএ বা এমআই৬ বর্তমানে তাঁকে ক্ষমতায় ফেরানোর পরিকল্পনা করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি তৈরি হয় না।
এ ধরনের দাবি সত্য হলে তা সৌদি রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার সমীকরণ এবং আঞ্চলিক রাজনীতির জন্য তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু এমন দাবির জন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন,নথি বা একাধিক স্বাধীন সূত্রের সমর্থন প্রয়োজন। শুধু কোনো বিশ্লেষকের বক্তব্য কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওর ভিত্তিতে একটি রাষ্ট্রের উত্তরাধিকার পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়।
সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ কি শুধু যুদ্ধের ফলেই নির্ধারিত হবে?
সৌদি যুবরাজ ও কার্যত দেশটির ক্ষমতাকেন্দ্র মোহাম্মদ বিন সালমানের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ কেবল হুতিদের সামরিক সক্ষমতা কিংবা ইরানের সঙ্গে সংঘাতের ওপর নির্ভর করে না। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সমর্থন, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের আনুগত্য, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, জনগণের মনোভাব, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং যুদ্ধের ফল—সবকিছুই এতে প্রভাব ফেলতে পারে।
হুতিদের হামলার ফলে সৌদি আরবের নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হলে সরকারের জন্য রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বাড়তে পারে। কিন্তু নিরাপত্তা সংকট মানেই শাসনব্যবস্থার পতন নয়। একইভাবে, সামরিক চাপের মুখে কোনো নেতৃত্ব দুর্বল হতে পারে, আবার পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নিজের অবস্থান আরও সংহতও করতে পারে। কোন পথে ঘটনা এগোবে, তা আগাম নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
অতএব, সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় আবেগময় পূর্বাভাসের বদলে ক্ষমতার বাস্তব কাঠামো, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সংঘাত মোকাবিলার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।
শেষ কথা: হুতিদের টিকে থাকা বাস্তবতা, কিন্তু সৌদি পতন অবশ্যম্ভাবী নয়
জন সাওয়ারের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইয়েমেনের সংঘাতকে শুধু সামরিক বিজয় বা পরাজয়ের হিসাবে দেখা যথেষ্ট নয়। দীর্ঘদিনের যুদ্ধ দেখিয়েছে, হুতিদের দুর্বল করা সম্ভব হলেও তাদের পুরোপুরি নির্মূল করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে। স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা, সংগঠনগত সক্ষমতা এবং ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ বিভাজন তাদের টিকে থাকার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।
একই সঙ্গে সৌদি আরবের ওপর হামলা, বিমান চলাচলে বিঘ্ন এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, আধুনিক সামরিক শক্তিধর একটি রাষ্ট্রও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে এই চাপ থেকে সৌদি ভূখণ্ডের বড় অংশ হাতছাড়া হয়ে যাবে কিংবা মোহাম্মদ বিন সালমানের পতন নিশ্চিত—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ঘিরে উত্তেজনা আরও বাড়লে তার প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে। সে কারণে আগামী দিনগুলোতে সামরিক পদক্ষেপ, কূটনৈতিক যোগাযোগ, বিমান চলাচলের নিরাপত্তা এবং ইয়েমেনের স্থানীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
ভূরাজনীতিতে সবচেয়ে বিপজ্জনক ভুলগুলোর একটি হলো সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ভবিষ্যৎ হিসেবে ধরে নেওয়া। হুতিদের টিকে থাকার সম্ভাবনা শক্তিশালী—কিন্তু সেটি সৌদি আরবের পতনের সমার্থক নয়। গোত্রীয় নেতাদের কথিত বৈঠক, বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কথিত ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনা কিংবা যুদ্ধ আসন্ন বলে প্রচারিত বক্তব্য—প্রতিটিই স্বাধীনভাবে যাচাই করা দরকার।
মধ্যপ্রাচ্য এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে, যেখানে সামরিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক সমঝোতা ও কূটনৈতিক সংযমের গুরুত্বও বাড়ছে। হুতিদের পরাজিত করা যাবে কি না, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন—এই সংঘাতের এমন কোনো রাজনৈতিক সমাধান তৈরি করা সম্ভব কি না, যাতে ইয়েমেন, সৌদি আরব এবং পুরো অঞ্চলকে আরও দীর্ঘ ও বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে না হয়।
ইকবাল মুন্না
সাংবাদিক ও নির্মাতা

মন্তব্য করুন