নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙামাটির খবরঃ- মেঘে ঢাকা পাহাড়, সবুজ উপত্যকা আর আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ—প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের টানে প্রতি বছর হাজারো পর্যটক ছুটে আসেন রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালিতে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে সেখানে গড়ে উঠেছে শতাধিক ছোট-বড় কটেজ ও রিসোর্ট। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন স্থানীয় অনেক মানুষ। কিন্তু একের পর এক অবরোধ, সংঘাত ও গোলা গুলির ঘটনায় সাজেকের পর্যটন ব্যবসায় দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি বুকিং বাতিল, অগ্রিম টাকা ফেরত এবং আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। শীতের প্রধান পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে পুরো পর্যটন খাত।

গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সাজেকের উজোবাজার ও গঙ্গারাম বাজার এলাকায় অবরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও গোলাগুলির ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) বিবৃতি অনুযায়ী, অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সময় অবরোধকারীরা সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। পরে আলোচনার একপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও পর্যটকদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যরা আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ রাউন্ড গুলি ছোড়েন বলে প্রাথমিকভাবে জানা যায়। সেনাবাহিনীর টহল দল পাল্টা গুলি চালালে সশস্ত্র ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে সরে যান। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বিত উদ্যোগে অবরুদ্ধ পর্যটকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে আইএসপিআরের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।

আইএসপিআর আরও জানায়, এ ধরনের সহিংসতা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও জননিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটনশিল্প এবং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে ঘটনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ধারণ করা জরুরি।

তিন দফা দাবিতে অবরোধ,বন্ধ পর্যটনকেন্দ্রঃ- সাজেক গণ-অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস-সন্তু লারমা) সশস্ত্র সদস্যদের সাজেক ভ্যালি থেকে সরিয়ে নেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। এর অংশ হিসেবে বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে সাজেক পর্যটন সড়কে তৃতীয় দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধ ঘোষণা করে সংগঠন দুটি। একই সঙ্গে পর্যটকদের সাজেক ছেড়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।

পরিস্থিতি বিবেচনায় পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা উল্লেখ করে সাজেক ভ্যালিতে পর্যটকদের প্রবেশ ও অবস্থানে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয় জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে নিরাপদে সাজেক ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় পর্যটকদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম চলাকালে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

এর মধ্যেই শনিবার (২৪ অক্টোবর) রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় অর্ধদিবস সড়ক অবরোধের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ছাত্র-সংগ্রাম জনতার পরিষদ নামে একটি সংগঠন। গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে সংগঠনটি এ কর্মসূচির কথা জানায়। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ভরা মৌসুমের আগে বড় ক্ষতির আশঙ্কাঃ-সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১০০টি কটেজ রয়েছে। পর্যটন মৌসুমে এসব কটেজে একসঙ্গে প্রায় আড়াই হাজার পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা হয়। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি—এই তিন মাস সাজেকের প্রধান পর্যটন মৌসুম। এ সময়কে ঘিরেই বছরের বড় অংশের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা করেন কটেজ ও রিসোর্ট মালিকেরা।

ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, এই তিন মাসে কটেজ মালিকদের ব্যবসার পরিমাণ প্রায় ২৭ কোটি টাকা। পর্যটকদের খাবারের পেছনে ব্যয় হয় প্রায় ২২ কোটি টাকা। এ ছাড়া ঘোরাঘুরি ও যাতায়াতে পর্যটকেরা ব্যয় করেন আরও প্রায় ২৭ কোটি টাকা। তবে এসব পরিসংখ্যান সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব; স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমীক্ষার তথ্য নয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বছরের সব সময় সমান পর্যটক আসেন না। ঈদ, পূজা, সরকারি ছুটি ও শীতের মৌসুমে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এই সময়ের আয় দিয়েই বছরের অন্য সময়ের তুলনামূলক কম ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তাঁরা। কিন্তু ভরা মৌসুমের ঠিক আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় তাঁদের সেই পরিকল্পনা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

বুকিং বাতিল,ফেরত দিতে হচ্ছে অগ্রিম টাকাঃ-সাম্প্রতিক অবরোধ ও সহিংসতার কারণে সাজেকে পর্যটকদের বুকিং বাতিল হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। অনেকে অগ্রিম টাকা ফেরত দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে একদিকে আয় বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে আগে থেকে নেওয়া বুকিংয়ের অর্থ ফেরত দেওয়ার চাপ সামলাতে হচ্ছে তাঁদের।

এক কটেজ ব্যবসায়ী জানান, পর্যটকদের বুকিং বাতিল হওয়ায় তিনি প্রায় এক লাখ টাকা ফেরত দিয়েছেন। অন্য ব্যবসায়ীদেরও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে শুধু বর্তমান বুকিং নয়, সামনের মাসগুলোর পর্যটন পরিকল্পনাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পর্যটকেরা সাজেক ভ্রমণ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকলে তাঁরা বিকল্প গন্তব্য বেছে নিতে পারেন। এতে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

শুধু কটেজ নয়, সংকটে স্থানীয় মানুষের আয়ওঃ- সাজেকের পর্যটনশিল্পের সঙ্গে কটেজ ও রিসোর্ট মালিকদের পাশাপাশি জড়িয়ে রয়েছে পরিবহনশ্রমিক, চালক,পর্যটক গাইড, রেস্তোরাঁকর্মী, খাবার সরবরাহকারী, স্থানীয় দোকানি এবং বিভিন্ন সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা। পর্যটক কমে গেলে এসব পেশার মানুষের আয়ও কমে যায়।

পর্যটকেরা না এলে কটেজে কাজের সুযোগ কমে, রেস্তোরাঁয় বিক্রি কমে এবং স্থানীয় দোকানপাটেও বেচাকেনা কমে যায়। ফলে পর্যটনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়লে তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়।

স্থানীয় অনেক পরিবার পর্যটকদের কাছে পণ্য বিক্রি, খাবার সরবরাহ, পরিবহনসেবা ও অন্যান্য কাজের মাধ্যমে সংসার চালান। পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকলে তাঁদের বিকল্প আয়ের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে যাঁরা পর্যটন মৌসুমের আয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা আর্থিক সংকট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পর্যটন চালুর দাবিঃ- সাজেকের পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতে, নিরাপত্তা পরিস্থিতির অনিশ্চয়তা দূর করা ছাড়া এই খাতকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন। তাঁরা প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে কার্যকর আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

তাঁদের দাবি, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, স্থানীয় বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে এবং সড়কে অবরোধ ও সহিংসতার কারণে যেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে না পড়েন, সে বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকর্ষণ করলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে সেই আকর্ষণ অর্থনৈতিক সম্ভাবনায় রূপ নেওয়া কঠিন। তাই পর্যটনশিল্পকে সচল রাখতে শুধু পর্যটনকেন্দ্র খুলে দেওয়াই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নিরাপদ যাতায়াত, স্থিতিশীল পরিবেশ এবং পর্যটকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা।

অবরোধ ও সংঘাতের কারণে সাজেকের পর্যটন খাতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা না গেলে আসন্ন শীতের মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে কটেজ ব্যবসা থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও শ্রমজীবী মানুষের আয়েও। ফলে সাজেকের বর্তমান সংকট শুধু পর্যটন ব্যবসার সমস্যা নয়, এটি পাহাড়ি জনপদের বহু মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও জড়িত।