রুমা, বান্দরবান- ছোটবেলায় হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে জমিয়েছিলেন ৩০ হাজার টাকা। সেই জমানো টাকায় কিনেছিলেন কমলার চারা। চন্দ্রঘোনা খ্রিস্টান মিশন হাস পাতালে নার্সিং কোর্স করার সময় অনেক কষ্টে গড়ে তোলা সেই সঞ্চয়ই ছিল তাঁর কৃষি উদ্যোগের প্রথম পুঁজি। আজ সেই গাছেই ফল ধরেছে। নিজের পরিশ্রমের ফল দেখে আনন্দিত আলাইমং মার্মা। তাঁর বাগানে এখন প্রায় ৫০০টি কমলাগাছ। পাশাপাশি রয়েছে মাল্টার বাগান, কয়েক শ চীনা হাঁস ও মাছ চাষের উদ্যোগ। রুমা বাজারে ‘সেবা ফার্মেসি’ নামে তাঁর ১টি ওষুধের দোকানও রয়েছে।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম প্রাংসা পাড়ার এই কৃষি উদ্যোক্তার সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের পরিশ্রম, সঞ্চয় ও নিজের পায়ে দাঁড়ানোর প্রত্যয়।
রুমা বাজার থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরে ১নম্বর পাইন্দু ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রাংসা পাড়ার অবস্থান। প্রায় ৯৫টি পরিবারের এই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজ ও জুম চাষের সঙ্গে যুক্ত। এখানে কমলা, মাল্টা, লেবু, ড্রাগন ফল,মার্ফা,মিষ্টি আলু,নারকেল,তেঁতুল,ধান, ভুট্টা, আদা,হলুদ,জলপাই,তিল ও আনারসসহ নানা ধরনের কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়।
কৃষিপণ্যের বৈচিত্র্য থাকলেও দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এখানকার কৃষকদের বড় সমস্যা। প্রাংসা পাড়ায় যাওয়ার সড়কটি সরু, ভাঙাচোরা ও উঁচু-নিচু। ফলে উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় উপকরণ আনা-নেওয়ায় দুর্ভোগ পোহাতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের।
গ্রামের বাসিন্দা ক্যচিংপ্রু মার্মা বলেন, একসময় গ্রামের মানুষকে পায়ে হেঁটে বাজারে যেতে হতো। বাজার থেকে কেনা খাবারসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিজেদের কাঁধে বহন করে বাড়িতে আনতে হতো। দুর্গম পথের কারণে তাঁদের ভোগান্তি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
কমলা ও মাল্টার বাগানের পাশাপাশি মাছ চাষেও বিনি য়োগ করেছেন আলাইমং মার্মা।নিজের টাকায় প্রায় ২০ শতক জমিতে পুকুর খনন করে মাছের পোনা ছেড়ে ছেন। মাছের জন্য অক্সিজেনের ব্যবস্থা করেছেন। তবে মাছের খাবার কিনতে প্রতি বস্তায় প্রায় ২ হাজার ২৮০ টাকা খরচ হয়। ব্যয় সামলাতে মাছের খাবারের পাশাপাশি রান্না করা ভাতও ব্যবহার করেন তিনি।
পুকুরে পানির সংকটও তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। কাছের ঝিরি থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি এনে পুকুরে সরবরাহ করেন। তাঁর ভাষ্য,এই ব্যবস্থা না থাকলে দুই দিনের মধ্যেই পুকুরের পানি শুকিয়ে যায়।পুকুর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষ ণের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলেও মাছ চাষ চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। গ্রামের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণে নিজের এই উদ্যোগকে আরও এগিয়ে নিতে চান আলাইমং। তবে আর্থিক সীমাবদ্ধতা তাঁর পথের অন্যতম বাধা।
দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে গড়ে তোলা কমলার বাগান আরও সমৃদ্ধ করতে চান আলাইমং মার্মা।কিন্তু গাছে রোগবালাই দেখা দিলে কোন ওষুধ ব্যবহার করতে হবে,কীভাবেসঠিক পরিচর্যা করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় কারিগরি পরামর্শ ও প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে বলে জানান তিনি।
আলাইমং মার্মা বলেন, “ছোটবেলায় অনেক কষ্ট করে হাতখরচের টাকা জমিয়েছিলাম। সেই ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কমলার চারা কিনে বাগান শুরু করি। শুরুটা সহজ ছিল না। আজ গাছে ফল ধরেছে, নিজের পরিশ্রমের ফল পাচ্ছি—এতে আমি খুবই খুশি। এবং সামনের বছরে আমি আরও ৪ হাজার কমলা গাছ রোপন করবো বলে জানান
তিনি আরও বলেন, “কৃষি বিভাগের কাছে আমার চাওয়া রাসায়নিক সার, জৈব সার ও একটি স্প্রে মেশিন। বাগানে রোগবালাই হলে কোন ওষুধ দিতে হবে,সে বিষয়ে পরামর্শ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ পেলে আরও ভালোভাবেবাগান পরিচর্যা করতে পারব।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সীমিত পুঁজি নিয়ে আলাইমং মার্মার এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষির সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। কমলা ও মাল্টার বাগান,হাঁস পালন,মাছ চাষ এবং ফার্মেসি ব্যব সার মাধ্যমে তিনি আয়ের একাধিক পথ তৈরি করেছেন।
রুমা উপজেলায় কৃষি কর্মকর্তা এ,কে এম ফরিদুল হক তিনি জানান অন্যান্য ফসলের তুলনায় কমলার চাষে দীর্ঘ মেয়াদী অর্থনৈতিক লাভ অনেক বেশি। একবার সঠিক পরিচর্যা করে বাগান গড়ে তুলতে পারলে বছরের পর বছর ফলন পাওয়া সম্ভব। রুমা উপজেলার উৎপাদিত কমলা যদি আমরা সঠিকভাবে বাজারজাত করতে পারি, তবে স্থানীয় কৃষকদের জীবনযাত্রার মান রাতারাতি বদলে যেতে পারে। এটি আমাদের এলাকার বেকারত্ব দূরীকরণ এবং যুবসমাজকে কৃষিমুখী করার এক জাদুকরী মাধ্যম হতে পারে।
তবে তাঁর মতো পাহাড়ি কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে প্রয়ো জন কৃষি উপকরণ, রোগবালাই দমনে কারিগরি পরামর্শ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা।এসব সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে প্রাংসা পাড়ার কৃষকেরা তাঁদের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও আরও বড় অবদান রাখতে পারবেন।

মন্তব্য করুন